বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল আজহা আনন্দ, ত্যাগ ও ভাগাভাগির বার্তা নিয়ে এলেও কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতে এবারের ঈদ যেন বেদনা আর দীর্ঘশ্বাসের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। কাঁটাতারের বেড়ায় ঘেরা আশ্রয়শিবিরে বসবাসরত লাখো রোহিঙ্গার জীবনে উৎসবের আনন্দের চেয়ে অনিশ্চয়তা, দারিদ্র্য ও বঞ্চনাই এখন বড় বাস্তবতা।
২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক নির্যাতনের মুখে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা। দীর্ঘ প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও তাদের বড় অংশ এখনও উখিয়া ও টেকনাফের শরণার্থী শিবিরে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। নিজ দেশে ফেরার স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেছে।
কক্সবাজারের বিভিন্ন আশ্রয়শিবির ঘুরে দেখা গেছে, চারদিকে ঈদের আমেজ থাকলেও রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে সেই আনন্দের ছোঁয়া খুবই সীমিত। কোথাও ছোট ছোট শিশুরা পুরোনো কাপড় পরে ঘুরছে, কোথাও পরিবারগুলো সামান্য খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খাচ্ছে। অনেকের ঘরে এবার কোরবানির মাংসও পৌঁছায়নি।
শরণার্থী শিবিরের বাসিন্দাদের অনেকে জানান, মিয়ানমারে থাকাকালে তাদের জীবন ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। নিজেদের জমি, গবাদিপশু ও ব্যবসা ছিল। ঈদ এলে পরিবার-পরিজন নিয়ে আনন্দে সময় কাটাতেন। কিন্তু বাস্তুচ্যুত হওয়ার পর সেই জীবন এখন শুধুই স্মৃতি।
এক রোহিঙ্গা শরণার্থী বলেন, আগে তাদের পরিবার স্বচ্ছল ছিল, কিন্তু এখন একটি মুরগি কেনার সামর্থ্যও নেই। বিদেশে থাকা আত্মীয়স্বজন যাদের সহায়তা করছেন, কেবল তারাই কিছুটা ভালোভাবে ঈদ পালন করতে পারছেন। বাকিরা মানবিক সহায়তার অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন।
আরেক নারী শরণার্থী জানান, আগে পরিবারে সাতজন সদস্য একসঙ্গে থাকলেও এখন ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছেন তারা। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় খাদ্যসংকট আরও বেড়েছে। আগে মাসে যে পরিমাণ আর্থিক সহায়তা পাওয়া যেত, এখন তা কমে গেছে। এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
রোহিঙ্গাদের অভিযোগ, আশ্রয়শিবিরগুলোতে শুধু খাদ্য সংকটই নয়, নিরাপত্তা পরিস্থিতিও দিন দিন খারাপ হচ্ছে। চুরি, ছিনতাই, মাদক ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে আতঙ্ক বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। বিশেষ করে রাতের বেলায় অনেক পরিবার নিজেদের নিরাপদ মনে করছে না।
টেকনাফ ও উখিয়ার বিভিন্ন ক্যাম্পে বর্তমানে লাখো রোহিঙ্গা বসবাস করছে। তবে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় তাদের জীবনযাত্রার মানও দ্রুত অবনতি হচ্ছে। কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে আগে বিভিন্ন সংস্থা বিপুলসংখ্যক পশু সরবরাহ করলেও এবার সেই সংখ্যা অনেক কমে গেছে।
ক্যাম্প পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা জানান, কয়েক বছর আগেও ঈদ উপলক্ষে হাজার হাজার গরু, ছাগল ও মহিষ সরবরাহ করা হতো। কিন্তু বর্তমানে তহবিল সংকটের কারণে সেই সহায়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে অনেক পরিবারকে ১০ থেকে ১৫ জন মিলে একটি ছোট গরু কিনে কোরবানি দিতে হচ্ছে।
রোহিঙ্গা শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা অর্থ সংকটে থাকায় আগের মতো সহায়তা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবুও সীমিত পরিসরে মাংস বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এবার উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি শিবিরে থাকা পরিবারগুলোর মধ্যে এক কেজি করে মাংস বিতরণের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, কর্মসংস্থানের অভাব এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় রোহিঙ্গা সংকট আরও জটিল হয়ে উঠছে। নতুন প্রজন্মের শিশুদের বড় একটি অংশ শিক্ষাবঞ্চিত অবস্থায় বেড়ে উঠছে, যা ভবিষ্যতে বড় সামাজিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
রোহিঙ্গা নেতারা বলছেন, তাদের সবচেয়ে বড় চাওয়া হচ্ছে নিরাপদ ও সম্মানজনকভাবে নিজ দেশে ফিরে যাওয়া। কিন্তু এখনো প্রত্যাবাসন কার্যকর না হওয়ায় শরণার্থী জীবনই তাদের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি ঈদেই তারা ফিরে তাকান হারিয়ে যাওয়া বাড়িঘর, আত্মীয়স্বজন আর স্মৃতিভরা গ্রামের দিকে।
জাতিসংঘের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি শরণার্থী শিবিরে প্রায় ১১ লাখ ৬০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছেন। এছাড়া ভাসানচরেও রয়েছেন আরও কয়েক হাজার মানুষ। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১২ লাখের কাছাকাছি।
ঈদের দিনে যখন চারদিকে আনন্দের আয়োজন, তখন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের অসংখ্য মানুষের চোখে-মুখে ফুটে উঠছে হারিয়ে যাওয়া মাতৃভূমির বেদনা। তাদের কাছে ঈদ এখন আর শুধু উৎসব নয়, বরং বেঁচে থাকার সংগ্রামের আরেকটি দিন।

