বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে এস আলম গ্রুপ। ব্যাংক জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে চলমান তদন্তের অংশ হিসেবে সাইপ্রাসের একটি আদালত শিল্পগোষ্ঠীটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম ও তার স্ত্রীর সম্পত্তি অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে।
সাইপ্রাসের নিকোসিয়া জেলা আদালত গত ১৯ মে এই আদেশ দেয়। দেশটির অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং ইউনিটের আবেদনের ভিত্তিতে আদালত পদক্ষেপ নেয় বলে জানা গেছে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আইনি সহায়তার অনুরোধ পাঠানোর পরই তদন্তে গতি আসে।
আদালতের আদেশ অনুযায়ী, সাইপ্রাসের পারেক্লিসিয়া এলাকায় থাকা একটি দোতলা বাড়ি আপাতত ফ্রিজ বা জব্দ অবস্থায় থাকবে। অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে পাচার হওয়া অর্থের একটি অংশ বিদেশে বিভিন্ন সম্পদ ও বিনিয়োগে ব্যবহার করা হয়েছে।
তবে মোহাম্মদ সাইফুল আলম তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, বিদেশে করা সব বিনিয়োগ বৈধ উৎসের অর্থ থেকেই হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপ রাজনৈতিক ও অন্যায্য।
বাংলাদেশি তদন্ত সংস্থাগুলোর অভিযোগ, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে একাধিক কোম্পানি ও আর্থিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়া হয়। পরে সেই অর্থের একটি বড় অংশ বিদেশে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বড় অঙ্কের ঋণ গ্রহণ ও তা খেলাপি হয়ে যাওয়ার বিষয়টি তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন দেশের কোম্পানি ও আর্থিক কাঠামোর মাধ্যমে অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সাইপ্রাস, সিঙ্গাপুর, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস ও জার্সিতে থাকা কিছু প্রতিষ্ঠান এবং ট্রাস্টের আর্থিক কার্যক্রমও তদন্তের আওতায় এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এর আগে প্রকাশ্যে দাবি করেছিলেন, জালিয়াতি ও অনিয়মের মাধ্যমে দেশ থেকে প্রায় ৮ বিলিয়ন ইউরোর বেশি অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে। এই অভিযোগের পর থেকেই বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্ব পেতে শুরু করে।
তদন্তের অন্যতম আলোচিত অংশ হচ্ছে সাইপ্রাসভিত্তিক ‘অ্যাক্লেয়ার ইন্টারন্যাশনাল’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। অভিযোগ রয়েছে, এই কোম্পানিকে ব্যবহার করে বিভিন্ন আর্থিক লেনদেন ও সম্পদ স্থানান্তর করা হয়েছে কি না, তা এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে বাংলাদেশের একটি আদালত সম্প্রতি ইসলামি ব্যাংকের একটি ঋণ জালিয়াতি মামলায় সাইফুল আলমসহ তার কয়েকজন আত্মীয় ও সহযোগীকে কারাদণ্ড দিয়েছে। অভিযোগ ছিল, ১৩৪টি বাস কেনার নামে নেওয়া ঋণের অর্থ অন্য খাতে ব্যবহার করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা শুধু একটি শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তদন্ত নয়; বরং বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের দীর্ঘদিনের দুর্বলতা, ঋণ অনিয়ম এবং অর্থ পাচারের বড় চিত্রও সামনে নিয়ে এসেছে।
অর্থনীতিবিদদের ভাষ্য, যদি অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়, তাহলে এটি দেশের আর্থিক খাতের জন্য বড় ধরনের আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রশ্নও আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

