আজ ৩০ মে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয় দিন। ১৯৮১ সালের এই দিনে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে এক সামরিক বিদ্রোহের ঘটনায় নিহত হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটলেও চার দশকেরও বেশি সময় পরও তিনি দেশের রাজনৈতিক আলোচনা ও ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন।
এ বছর তার ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে দেশজুড়ে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। ২৫ মে থেকে ১ জুন পর্যন্ত আট দিনের কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে কালো পতাকা উত্তোলন, আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিল, আলোকচিত্র প্রদর্শনী এবং অসহায় মানুষের মধ্যে খাদ্য ও বস্ত্র বিতরণ।
শনিবার ভোর থেকেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা এবং কালো পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে কর্মসূচি শুরু হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কর্মসূচিরও আয়োজন করা হয়েছে।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে আলোচনা করতে গেলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রসঙ্গ অনিবার্যভাবে সামনে আসে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রারম্ভিক পর্যায়ে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠের মাধ্যমে তিনি দেশব্যাপী আলোচনায় আসেন। পরে তিনি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক নেতৃত্ব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য “বীর উত্তম” খেতাবে ভূষিত হন।
স্বাধীনতার পরবর্তী অস্থির সময়ে দেশের রাজনীতিতে দ্রুত উত্থান ঘটে তার। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার নেতৃত্বে দেশের রাজনৈতিক কাঠামোয় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে পুনরায় সক্রিয় করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তার আমলে রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয় এবং জাতীয় রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল প্রতিষ্ঠা করে দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তির ভিত্তি নির্মাণ করেন।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও তার শাসনামল নিয়ে আলোচনা হয়। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, খাল পুনঃখনন এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করার নানা উদ্যোগ সে সময় গ্রহণ করা হয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টার কারণে গ্রামীণ এলাকায় উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছিল।
শ্রমবাজার সম্প্রসারণেও তার অবদান উল্লেখ করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি শ্রমিক পাঠানোর প্রক্রিয়া প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে শুরু করে তার সময়েই। পরবর্তীকালে যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে।
আঞ্চলিক কূটনীতিতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন বলে মনে করা হয়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির যে ধারণা পরে একটি আঞ্চলিক জোটে রূপ নেয়, তার পেছনেও জিয়াউর রহমানের চিন্তাধারার প্রভাব ছিল বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে তার রাজনৈতিক জীবন শুধুমাত্র প্রশংসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে তার শাসনকাল নিয়ে বিভিন্ন বিতর্ক, মতপার্থক্য এবং ভিন্নধর্মী মূল্যায়নও রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, জিয়াউর রহমানকে মূল্যায়ন করতে হলে তার সাফল্য, সীমাবদ্ধতা এবং সময়ের বাস্তবতাকে একসঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
৪৫ বছর পরও তার নাম বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রাসঙ্গিক। সমর্থকদের কাছে তিনি জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অন্যতম প্রধান স্থপতি, অন্যদিকে সমালোচকরা তার শাসনামলের বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কিন্তু একটি বিষয় নিয়ে দ্বিমত কম—বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তিনি একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং আলোচিত ব্যক্তিত্ব।
আজকের দিনে তার স্মরণে আয়োজিত বিভিন্ন কর্মসূচি শুধু একজন সাবেক রাষ্ট্রপতিকে শ্রদ্ধা জানানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে নতুন করে স্মরণ ও মূল্যায়নেরও সুযোগ তৈরি করছে।
৪৫ বছর আগে ঘটে যাওয়া সেই ঘটনা আজও দেশের রাজনৈতিক স্মৃতিতে গভীরভাবে অম্লান। সময়ের ব্যবধানে প্রজন্ম বদলেছে, রাজনৈতিক বাস্তবতা পরিবর্তিত হয়েছে, কিন্তু জিয়াউর রহমানকে ঘিরে আলোচনা, মূল্যায়ন এবং বিতর্ক এখনো বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

