বিশ্বের নানা প্রান্তে যুদ্ধ, সংঘাত ও মানবিক সংকট যখন ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করছে, তখন শান্তি প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন হাজারো শান্তিরক্ষী। জীবনকে ঝুঁকির মুখে রেখে তারা প্রতিদিন কাজ করছেন সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলে, যেখানে নিরাপত্তাহীনতা ও অনিশ্চয়তা নিত্যসঙ্গী। এমন বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের অবদানকে আবারও উচ্চ প্রশংসায় স্মরণ করেছে জাতিসংঘ।
২৯ মে পালিত হয়েছে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘শান্তিতে বিনিয়োগ’। দিবসটি উপলক্ষে প্রকাশিত বিভিন্ন বক্তব্য ও বার্তায় শান্তিরক্ষীদের আত্মত্যাগ, সাহসিকতা এবং মানবিক দায়িত্ববোধের বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়।
বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে জাতিসংঘের অধীনে ৫০ হাজারেরও বেশি শান্তিরক্ষী দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের মধ্যে চার হাজারের বেশি সদস্য বাংলাদেশ থেকে গেছেন। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অস্থির অঞ্চলে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা শুধু নিরাপত্তা রক্ষাই নয়, বরং স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জন, মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা এবং স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪৮ সাল থেকে এখন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রায় সাড়ে চার হাজার শান্তিরক্ষী প্রাণ হারিয়েছেন। শুধু গত বছরই নিহত হয়েছেন ৫৯ জন। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, শান্তিরক্ষা কোনো সহজ দায়িত্ব নয়; বরং এটি এমন একটি কাজ যেখানে প্রতিটি দিনই জীবন-মৃত্যুর ঝুঁকি বহন করে।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস দিবসটি উপলক্ষে দেওয়া বার্তায় বলেন, শান্তিরক্ষীরা বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় গিয়ে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছেন এবং সংঘাত নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তিনি উল্লেখ করেন, এসব কর্মী শুধু নিরাপত্তা রক্ষার কাজই করেন না, বরং নির্বাচন পরিচালনা, মানবিক সহায়তা কার্যক্রম তদারকি এবং রাজনৈতিক সমাধানের পরিবেশ তৈরিতেও ভূমিকা রাখেন।
তিনি অতীত ও বর্তমানের সব শান্তিরক্ষীর প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং দায়িত্ব পালনকালে নিহত সদস্যদের স্মরণ করেন গভীর সম্মানের সঙ্গে। তার মতে, শান্তির জন্য কাজ করতে গিয়ে কোনো প্রাণহানি কখনোই কাম্য হতে পারে না।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বিশ্বের অস্থির পরিস্থিতিতে শান্তিরক্ষীদের ভূমিকা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন দেশে গৃহযুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মানবিক সংকট মোকাবিলায় জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে কাজ করছে।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অন্যতম বড় অবদানকারী দেশ। শুধু সংখ্যার দিক থেকেই নয়, পেশাদারিত্ব, মানবিকতা এবং দক্ষতার কারণেও বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ সুনাম অর্জন করেছেন। বিভিন্ন মিশনে তাদের দায়িত্বশীল আচরণ ও জনগণের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তোলার সক্ষমতা বারবার প্রশংসিত হয়েছে।
বাংলাদেশে জাতিসংঘ কার্যালয়ও এক বিবৃতিতে শান্তিরক্ষীদের অবদানকে বিশেষভাবে তুলে ধরেছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে আরও বেশি বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। শান্তিরক্ষীদের কার্যক্রম সেই প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
বিশ্বব্যাপী সংঘাতের ধরন পরিবর্তিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শান্তিরক্ষীদের দায়িত্বও আরও জটিল হয়ে উঠছে। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধ, সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা এবং মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে কাজ করতে গিয়ে তাদের নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এ কারণে তাদের নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেছে জাতিসংঘ।
আগামী ৫ জুন জাতিসংঘ সদর দপ্তরে শান্তিরক্ষী স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে নিহত শান্তিরক্ষীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হবে। একই অনুষ্ঠানে দায়িত্ব পালনকালে প্রাণ হারানো সদস্যদের মরণোত্তর সম্মাননা প্রদান করা হবে।
বাংলাদেশের জন্য এটি শুধু একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নয়; বরং বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় দেশের দীর্ঘদিনের অবদানেরও স্বীকৃতি। যুদ্ধ ও সংঘাতের অন্ধকারে যখন অনেক অঞ্চল অনিশ্চয়তায় ডুবে থাকে, তখন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা সেখানে শান্তি, মানবতা এবং আশার প্রতীক হয়ে কাজ করেন। সেই কারণেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শান্তিরক্ষার প্রসঙ্গ উঠলেই বাংলাদেশের নাম বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে উচ্চারিত হয়।

