দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া হাম পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও আট শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে এক হাজারের বেশি শিশুর মধ্যে হামের লক্ষণ শনাক্ত হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত সময়ে হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে আট শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে তিনজন, সিলেট বিভাগে দুইজন, চট্টগ্রাম বিভাগে একজন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে।
নতুন এই মৃত্যুর ঘটনায় দেশে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর থেকে মোট মৃত শিশুর সংখ্যা বেড়ে ৫৮৩ জনে পৌঁছেছে। এর মধ্যে ৪৯৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে, আর পরীক্ষার মাধ্যমে হাম শনাক্ত হওয়ার পর মারা গেছে আরও ৯০ শিশু। ফলে রোগটির বিস্তার এবং এর জটিলতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ৬৯ হাজার ৬১২ শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। আক্রান্ত শিশুদের একটি বড় অংশকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। এ সময় বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৫৫ হাজার ৭০৫ শিশু।
তবে আশার খবরও রয়েছে। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ৫২ হাজার ৫০ শিশু। চিকিৎসকরা বলছেন, দ্রুত চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা গেলে অধিকাংশ আক্রান্ত শিশুকে সুস্থ করা সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু যেসব ক্ষেত্রে চিকিৎসা নিতে দেরি হচ্ছে বা জটিলতা দেখা দিচ্ছে, সেসব ক্ষেত্রে ঝুঁকি অনেক বেড়ে যাচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত পরীক্ষাগারে ৮ হাজার ৯৯৬ শিশুর শরীরে হাম ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, উপসর্গ দেখা দেওয়া সব শিশুর পরীক্ষা করা সম্ভব না হওয়ায় প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। একজন আক্রান্ত শিশুর কাছ থেকে খুব সহজেই অন্য শিশুদের মধ্যে এটি ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব শিশু টিকাদানের আওতায় আসেনি অথবা যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল, তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় টিকাদান কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তারা সতর্ক করে বলেছেন, সংক্রমণের গতি নিয়ন্ত্রণে না এলে আগামী দিনগুলোতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, শিশুদের শরীরে জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হওয়া বা গায়ে লালচে ফুসকুড়ির মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় শিশুদের টিকা নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
ক্রমবর্ধমান এই পরিস্থিতিতে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে আক্রান্ত শিশুদের ভিড় বাড়ছে, আর স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টরা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবু প্রতিদিন নতুন আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় জনমনে উদ্বেগ কাটছে না।

