রাজধানীতে কোরবানির পশুর বর্জ্য ও দৈনন্দিন আবর্জনা অপসারণে অসন্তোষ প্রকাশ করে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আরও ছয় শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর আগে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে দুই আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছে। নতুন নির্দেশনার ফলে দুই সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস দেখা দিয়েছে।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রী নিজেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বাস্তব চিত্র পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনের সময় তিনি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও বাণিজ্যিক এলাকায় ময়লা-আবর্জনা জমে থাকতে দেখেন। এতে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার নির্দেশ দেন।
পরিদর্শনকালে রাজধানীর হাতিরপুল, এলিফ্যান্ট রোড, গ্রিন রোড, ফার্মগেট ও কারওয়ান বাজারসহ কয়েকটি এলাকায় বর্জ্য দ্রুত অপসারণ না হওয়ায় দুই আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তাদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যস্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিভাগীয় তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম গণমাধ্যমকে জানান, প্রধানমন্ত্রী মূলত রাজধানীর উন্নয়ন কার্যক্রম, কোরবানির পশুর বর্জ্য অপসারণ এবং নগর পরিচ্ছন্নতার অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য সরেজমিনে বের হয়েছিলেন। কিন্তু কয়েকটি এলাকায় প্রত্যাশিত মানের পরিচ্ছন্নতা না পাওয়ায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত দেন।
সরকারের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এবং প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করতে বলা হয়েছে। মোট ছয়জন শীর্ষ কর্মকর্তা এই নির্দেশনার আওতায় পড়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, কোরবানির বর্জ্য দ্রুত অপসারণ, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা সচল রাখা এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করতে পারেননি। ফলে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে প্রত্যাহারসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মোহাম্মদ মামুনুল হাসান। একই সিটিতে প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমডোর মোহাম্মদ হুমায়ুন কবীর এবং প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী দায়িত্বে রয়েছেন। অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম, প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মো. মাহবুবুর রহমান তালুকদার এবং প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান দায়িত্ব পালন করছেন।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, শুধু মাঠপর্যায়ের কর্মীদের ওপর দায় চাপিয়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে পরিকল্পনা, তদারকি, জনবল ব্যবস্থাপনা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সিটি করপোরেশনের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা যদি কার্যকর সমন্বয় করতে ব্যর্থ হন, তাহলে পুরো ব্যবস্থাপনায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, রাজধানীতে কোরবানির ঈদের সময় বর্জ্যের পরিমাণ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি, পর্যাপ্ত যানবাহন, পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং সার্বক্ষণিক মনিটরিং প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ঘাটতি থাকলে নগরবাসীকে ভোগান্তির মুখে পড়তে হয় এবং পরিবেশগত ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।
প্রধানমন্ত্রীর এই আকস্মিক পরিদর্শন এবং তাৎক্ষণিক প্রশাসনিক পদক্ষেপকে অনেকেই নগর ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার বার্তা হিসেবে দেখছেন। সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে দুই সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক কাঠামোয় আরও পরিবর্তন আসতে পারে এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন নির্দেশনা দেওয়া হতে পারে। রাজধানীর পরিচ্ছন্নতা ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় সরকারের এই কঠোর অবস্থান কতটা কার্যকর হয়, এখন সেদিকেই নজর নগরবাসীর।

