দারিদ্র্য আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে দীর্ঘদিন লড়াই করে আসছিলেন নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার দুই অসহায় মানুষ মাসুদ মিয়া ও হরমুজা বেগম। কখনো কাজ থাকত, কখনো থাকত না। কোনো দিন দুবেলা খাবার জুটলেও অনেক দিন কাটত অভাব-অনটনের মধ্যে। জীবনের কঠিন বাস্তবতায় ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় কোনো স্বপ্ন দেখার সুযোগও ছিল না তাঁদের।
কিন্তু ঈদের পরপরই তাঁদের জীবনে এলো এক বিরল পরিবর্তন। একটি মানবিক সহায়তা কর্মসূচির মাধ্যমে এক লাখ টাকা করে আর্থিক অনুদান পেয়ে মুহূর্তেই নতুন আশার আলো দেখতে শুরু করেছেন এই দুই ব্যক্তি। দীর্ঘদিনের হতাশা আর কষ্টের জায়গায় এখন জায়গা করে নিয়েছে আত্মবিশ্বাস ও স্বাবলম্বী হওয়ার প্রত্যাশা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সেনবাগ উপজেলার একটি সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক সংগঠন প্রতিবছরের মতো এবারও ঈদ-পরবর্তী বিশেষ সহায়তা কর্মসূচির আয়োজন করে। এর অংশ হিসেবে এলাকার অসহায়, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মধ্য থেকে পূর্বনির্ধারিত প্রক্রিয়ায় নাম নির্বাচন করা হয়। পরে লটারির মাধ্যমে দুইজনকে এক লাখ টাকা করে অনুদান দেওয়ার জন্য মনোনীত করা হয়।
শুক্রবার রাতে সেনবাগের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাঠে আয়োজিত অনুষ্ঠানে নির্বাচিত দুজনকে সম্মাননা জানানো হয়। তাঁদের বাড়ি থেকে বিশেষভাবে অনুষ্ঠানে নিয়ে আসা হয় এবং উপস্থিত মানুষের করতালির মধ্য দিয়ে আর্থিক সহায়তা তুলে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে আয়োজন করা হয় আপ্যায়নেরও।
স্থানীয়দের মতে, সাধারণত অসহায় মানুষের জন্য স্বল্প পরিমাণ সহায়তা দেওয়া হলেও একসঙ্গে এত বড় অঙ্কের অর্থ সহায়তা পাওয়ার ঘটনা এলাকায় খুব একটা দেখা যায় না। ফলে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। অনেকেই এটিকে ব্যতিক্রমধর্মী সামাজিক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন।
প্রতিবন্ধকতা ও অসুস্থতার কারণে মাসুদ মিয়া নিয়মিত কাজ করতে পারেন না। শারীরিক অবস্থার কারণে একদিন কাজ করলে কয়েক দিন বিশ্রামে থাকতে হয়। এতে পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে তাঁর সংসারে প্রায়ই নেমে আসত অর্থকষ্ট। অন্যদিকে হরমুজা বেগমও দীর্ঘদিন ধরে মানুষের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করে জীবনযাপন করছিলেন।
অনুদান পাওয়ার পর আবেগাপ্লুত প্রতিক্রিয়ায় হরমুজা বেগম বলেন, জীবনে কখনো একসঙ্গে এত টাকা হাতে পাবেন, তা কল্পনাও করেননি। তিনি এই অর্থ দিয়ে গাভী কিনে ছোট পরিসরে খামার গড়ে তোলার পাশাপাশি জমি নিয়ে কৃষিকাজ শুরু করার পরিকল্পনা করছেন। তাঁর বিশ্বাস, সঠিকভাবে অর্থ ব্যবহার করতে পারলে ভবিষ্যতে আর কারও কাছে সাহায্যের জন্য হাত পাততে হবে না।
অন্যদিকে মাসুদ মিয়ার পরিবারও এই সহায়তাকে জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখছে। তাঁর স্ত্রী জানান, দীর্ঘদিন ধরে অর্থসংকটের কারণে পরিবারের অনেক প্রয়োজন পূরণ করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে মেয়ের বিয়ের বয়স হলেও আর্থিক অক্ষমতার কারণে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছিল না। এখন পাওয়া অর্থের একটি অংশ দিয়ে মেয়ের বিয়ের আয়োজন এবং বাকি অর্থ আয়বর্ধক কাজে বিনিয়োগ করার চিন্তা করছেন তাঁরা।
আয়োজকদের দাবি, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য শুধু সাময়িক সহায়তা দেওয়া নয়; বরং একজন মানুষকে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া। তাদের মতে, অল্প অঙ্কের অনুদান সাময়িক স্বস্তি দিলেও বড় পরিবর্তন আনে না। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে কিছুটা বড় সহায়তা দেওয়া গেলে একজন ব্যক্তি নিজের পায়ে দাঁড়ানোর বাস্তব সুযোগ পেতে পারেন।
সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গত কয়েক বছর ধরে ঈদের পর এমন কর্মসূচি চালিয়ে আসা হচ্ছে। এ পর্যন্ত একাধিক অসহায় মানুষকে বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তাঁদের অনেকেই বর্তমানে ছোট ব্যবসা, কৃষিকাজ বা অন্যান্য আয়মুখী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।
অনুষ্ঠানে আরও একটি বিশেষ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়, যেখানে কয়েকটি নিম্নআয়ের পরিবারকে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী বাজার করার সুযোগ দেওয়া হয়। পরিবারগুলোর সদস্যরা নিজেদের পছন্দের খাদ্যপণ্য বেছে নিতে পেরে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।
স্থানীয় সমাজকর্মীরা বলছেন, দারিদ্র্য বিমোচনে এমন উদ্যোগ ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ, শুধু অনুদান নয়, আত্মনির্ভরশীল হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করাই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে কার্যকর সহায়তা। তাঁদের মতে, সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ ও প্রতিষ্ঠানগুলো এ ধরনের উদ্যোগে এগিয়ে এলে আরও অনেক অসহায় পরিবারের জীবন বদলে যেতে পারে।
ঈদের আনন্দের আবহে সেনবাগের এই ব্যতিক্রমী মানবিক উদ্যোগ এখন এলাকাজুড়ে প্রশংসিত হচ্ছে। মাসুদ মিয়া ও হরমুজা বেগমের মতো মানুষের কাছে এটি শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, বরং নতুন জীবন শুরুর এক বিরল সুযোগ হিসেবেই ধরা দিয়েছে।

