রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ-দ্বীন হাসপাতালে নবজাতক মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগ। হাসপাতালের ভেতরে প্রবেশকে কেন্দ্র করে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনায় কয়েকজন সাংবাদিক আহত হওয়ার অভিযোগ ওঠার পর এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ঘটনার জন্য তারা দুঃখ প্রকাশ করেছে এবং পরিস্থিতিকে অনাকাঙ্ক্ষিত বলে উল্লেখ করেছে।
গত ২৭ মে হাসপাতালটিতে এক থেকে তিন দিন বয়সী ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ হাসপাতাল পরিদর্শন ও তদন্ত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এ ঘটনার মধ্যেই শনিবার বিকেলে হাসপাতালটি পরিদর্শনে যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। পরিদর্শন শেষে তিনি হাসপাতালের একটি ভবনে বেকারি কারখানার অস্তিত্বের কথা জানান এবং সেখান থেকে নির্গত গ্যাস বা অন্য কোনো পরিবেশগত কারণে নবজাতকদের ক্ষতি হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার কথা বলেন।
মন্ত্রীর ওই বক্তব্যের পর বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমের আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। সন্ধ্যার দিকে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি হাসপাতালটিতে তথ্য সংগ্রহের জন্য গেলে সেখানে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ভবনের প্রবেশপথ সীমিত করে দেয় এবং সাংবাদিকদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়। এ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা উপস্থিত থাকলেও হাসপাতালের নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের একটি অংশ সাংবাদিকদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। পরে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী আহত হন এবং একটি টেলিভিশন চ্যানেলের ক্যামেরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগও সামনে আসে। ঘটনার পর সাংবাদিক মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
রাতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, নবজাতকদের মৃত্যুর ঘটনার পর টানা কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, তদন্ত দল এবং বিপুলসংখ্যক গণমাধ্যমকর্মীর উপস্থিতির কারণে হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রম চাপে পড়ে। চিকিৎসক, নার্স এবং অন্যান্য কর্মীরা অতিরিক্ত মানসিক চাপের মধ্যে দায়িত্ব পালন করছিলেন। একই সঙ্গে হাসপাতালে ভর্তি রোগী ও তাদের স্বজনদেরও নানা ধরনের অসুবিধার মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সফর শেষ হওয়ার পর বিপুলসংখ্যক সাংবাদিক হাসপাতালে প্রবেশের চেষ্টা করলে রোগীদের স্বার্থ বিবেচনায় তাদের প্রবেশ সীমিত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ সময় কথোপকথনের একপর্যায়ে হাসপাতালের কিছু পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিজেদের প্রতি অবমাননাকর মন্তব্য করা হয়েছে বলে মনে করেন। এর জেরে তারা আবেগপ্রবণ ও উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আরও দাবি করেছে, উপস্থিত জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা শুরু থেকেই পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেছেন এবং উত্তেজনা কমাতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়নি।
বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, গণমাধ্যমের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক বজায় রাখা তাদের দীর্ঘদিনের নীতি। সংবাদকর্মীদের কাজের গুরুত্ব স্বীকার করে তারা ঘটনার কারণে সৃষ্ট অসন্তোষের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে কর্মীদের আচরণে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে বিষয়টি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার আহ্বান জানিয়েছে।
এদিকে নবজাতকদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে গঠিত তদন্ত কমিটির কাজ এখনও চলমান রয়েছে। স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, হাসপাতালের ভেতরের পরিবেশ, অবকাঠামোগত নিরাপত্তা, বায়ু চলাচল ব্যবস্থা এবং সম্ভাব্য দূষণের উৎসসহ সব বিষয় খতিয়ে দেখা জরুরি। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাও আলাদাভাবে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
নবজাতক মৃত্যুর রহস্য, হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ এবং সাংবাদিক নিগ্রহের অভিযোগ—এই তিনটি বিষয় এখন জনমনে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পরই ঘটনার প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে।

