রাজধানীর মগবাজারে আদ-দ্বীন হাসপাতালে একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনার চার দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি কী কারণে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। তদন্ত কার্যক্রম চলমান থাকলেও ময়নাতদন্ত না হওয়ায় প্রকৃত কারণ নির্ধারণে বড় ধরনের জটিলতার মুখে পড়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে ঘটনার ব্যাখ্যা খুঁজতে তদন্তকারীদের এখন পরিবেশগত তথ্য, সাক্ষ্য-প্রমাণ, প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনার ওপরই বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গঠিত তদন্ত কমিটি এখনো চূড়ান্ত প্রতিবেদনের কাজ শেষ করেনি। ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আরও বিস্তারিতভাবে কথা বলার জন্য অতিরিক্ত সময় চাওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন হাতে না পাওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
ঘটনার গুরুত্ব আরও বেড়েছে এ কারণে যে, মারা যাওয়া নবজাতকদের মধ্যে কারও গুরুতর অসুস্থতার তথ্য প্রাথমিকভাবে পাওয়া যায়নি। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্থ বা স্থিতিশীল অবস্থায় থাকা একাধিক নবজাতকের স্বল্প সময়ের ব্যবধানে মৃত্যু অত্যন্ত অস্বাভাবিক ঘটনা। তাই এর পেছনে একটি নির্দিষ্ট কারণ থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো সংক্রমণ, জন্মগত জটিলতা বা অন্যান্য চিকিৎসাজনিত সমস্যার কারণে মৃত্যু ঘটলেও সাধারণত একটি নির্দিষ্ট সময় ধরে লক্ষণ প্রকাশ পায়। কিন্তু এখানে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে একের পর এক শিশুর অবস্থার অবনতি হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, যা ঘটনাটিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে ময়নাতদন্তকে এমন ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানী পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ মৃত্যুর পর দেহের অভ্যন্তরীণ অবস্থা, শ্বাসতন্ত্র, রক্ত, টিস্যু বা সম্ভাব্য বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতি পরীক্ষা করে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়া যায়। কিন্তু নিহত শিশুদের পরিবারের অনীহার কারণে ময়নাতদন্ত করা হয়নি। ফলে তদন্তকারীদের হাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক প্রমাণের উৎসটি অনুপস্থিত রয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধুমাত্র শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে—এমন ব্যাখ্যা বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণ করা কঠিন। তারা মনে করেন, বায়ু চলাচল ব্যবস্থা, পরিবেশগত কোনো দূষণ, অজানা গ্যাসের উপস্থিতি কিংবা অন্য কোনো অস্বাভাবিক উপাদান ছিল কি না, তা গভীরভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষজ্ঞ দল হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট কক্ষ পরিদর্শন করে। প্রাথমিক পরীক্ষায় মানবদেহের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষতিকর কোনো গ্যাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়নি বলে জানা গেছে। তবে কক্ষে ঝাঁঝালো গন্ধের বিষয়টি এখনো তদন্তের অংশ হিসেবে বিবেচনায় রয়েছে। গন্ধটির উৎস বা প্রকৃতি সম্পর্কে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনার রাতে পোস্ট-অপারেটিভ ওয়ার্ডে থাকা কয়েকজন মা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বন্ধ করার অনুরোধ করেন। পরে কিছু সময়ের জন্য এসি বন্ধ রাখা হয় এবং পরবর্তীতে আবার চালু করা হয়। এরপর কয়েকজন নবজাতকের অস্বাভাবিক আচরণ ও শারীরিক সমস্যার লক্ষণ দেখা দিলে তাদের দ্রুত নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নেওয়া হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছয় নবজাতককে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
তবে এই বর্ণনার সঙ্গে নিহত শিশুদের পরিবারের কিছু বক্তব্যের অমিল রয়েছে। কয়েকজন অভিভাবকের অভিযোগ, শিশুদের অসুস্থ হয়ে পড়ার সময় ওয়ার্ডে প্রয়োজনীয় সংখ্যক নার্স বা স্বাস্থ্যকর্মী উপস্থিত ছিলেন না। তাদের দাবি, সংকটময় মুহূর্তে স্বজনেরাই শিশুদের নিয়ে ছুটোছুটি করেছেন এবং পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
দুই নবজাতক হারানো এক মায়ের ভাষ্য অনুযায়ী, রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওয়ার্ডজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। একের পর এক শিশু কান্না শুরু করে এবং তাদের শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। তিনি কক্ষে অস্বাভাবিক গন্ধ থাকার কথাও উল্লেখ করেছেন। তার দাবি, ওই গন্ধ আগেও অনুভূত হলেও সেদিন তা আরও তীব্র ছিল।
এদিকে ঘটনার পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের যৌথ অভিযানে হাসপাতালটিকে তিন লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। অভিযানে তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার ঘাটতি এবং স্বাস্থ্যসেবা পরিচালনায় কিছু অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে বলে জানানো হয়েছে। তবে জরিমানার বিষয়টি নবজাতকদের মৃত্যুর কারণের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
ঘটনাটি দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় নবজাতক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের মৃত্যুর ঘটনায় প্রকৃত কারণ উদঘাটন করা শুধু দায় নির্ধারণের জন্য নয়, ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কারণ জানা না গেলে প্রয়োজনীয় নীতিগত ও কারিগরি সংশোধন করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন এখন এই ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে ময়নাতদন্তের সুযোগ না থাকায় সেই প্রতিবেদনের সীমাবদ্ধতা নিয়েও ইতোমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ আদৌ পুরোপুরি জানা যাবে কি না, তা নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে।
এদিকে সন্তান হারানো পরিবারগুলোর একটাই দাবি—যদি কোনো অবহেলা, ত্রুটি বা গাফিলতি থেকে থাকে, তবে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তাদের প্রত্যাশা, এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হবে এবং ভবিষ্যতে আর কোনো পরিবারকে এমন বেদনাদায়ক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে না।

