দেশজুড়ে কোরবানির পশুর বাজারে এবার দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি পশু সরবরাহ হওয়ায় ঈদের আগের রাত থেকেই বিভিন্ন হাটে দাম কমতে শুরু করে। ফলে বিপুলসংখ্যক খামারি ও ব্যবসায়ী প্রত্যাশিত মূল্য তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচও তুলতে পারেননি। প্রাথমিক হিসাব বলছে, কোরবানি শেষে সারা দেশে ২২ লাখেরও বেশি পশু অবিক্রীত থেকে গেছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর কোরবানির জন্য সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছিল ১ কোটি ১ লাখের কিছু বেশি পশু। কিন্তু খামার ও গৃহপালিত উৎস মিলিয়ে প্রস্তুত ছিল প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৪ হাজার পশু। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় প্রায় ২২ লাখের বেশি পশু অতিরিক্ত ছিল বাজারে।
সরকারি প্রাথমিক মূল্যায়নে দেখা যাচ্ছে, দেশে এবার কোরবানি হয়েছে প্রায় ১ কোটি পশু। সেই হিসাবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া বিক্রি ছাড়াই খামার ও মালিকদের কাছে ফিরে গেছে। তবে চূড়ান্ত সংখ্যা নির্ধারণের কাজ এখনো চলমান রয়েছে।
রাজধানীর বৃহত্তম পশুর হাটগুলোতে ঈদের দিন সকালেও দেখা গেছে অবিক্রীত পশু নিয়ে বাড়ি ফেরার দৃশ্য। অনেক ব্যবসায়ী ট্রাক ভাড়া করে গরু ফিরিয়ে নিয়েছেন, আবার কেউ কেউ পরিবহন সংকটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেছেন। অনেকে শেষ মুহূর্তে বড় ধরনের লোকসান মেনে কম দামে পশু বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন।
খামারিদের অভিযোগ, কয়েক মাস ধরে পশু লালন-পালনে ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। গোখাদ্য, ভুসি, খড়, ওষুধ এবং শ্রমিকের মজুরি—সবকিছুর দাম ছিল উচ্চ পর্যায়ে। কিন্তু বাজারে ক্রেতার উপস্থিতি প্রত্যাশার তুলনায় কম থাকায় সেই ব্যয় আর বিক্রয়মূল্যে প্রতিফলিত হয়নি।
বিভিন্ন জেলার খামারি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেকেই ঋণ নিয়ে বা ধারদেনা করে পশু কিনেছিলেন। ঈদের শেষ মুহূর্তে ঋণ পরিশোধের চাপ থাকায় তারা কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে একটি গরুতে কয়েক হাজার থেকে এক লাখ টাকারও বেশি লোকসান গুনতে হয়েছে বলে দাবি করেছেন ব্যবসায়ীরা।
বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে এই পরিস্থিতির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সংকোচন। গত কয়েক বছরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক চাপের কারণে অনেক পরিবার কোরবানির বাজেট কমিয়েছে। কেউ ছোট পশু কিনেছেন, আবার অনেকে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কোরবানি দিয়েছেন।
আরেকটি বড় কারণ ছিল বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ। খামারিরা গত বছরের চাহিদা ও মূল্য বিবেচনায় এ বছর বেশি সংখ্যক পশু প্রস্তুত করেছিলেন। কিন্তু বাস্তব বাজার পরিস্থিতি সেই প্রত্যাশাকে সমর্থন করেনি। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সীমান্তবর্তী অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে গবাদিপশু লালন-পালন ও সরবরাহের একটি বড় নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। কোরবানিকে কেন্দ্র করে কয়েক মাস আগে থেকেই পশু মোটাতাজাকরণ শুরু হয়। এ বছর বিপুলসংখ্যক খামার একই সময়ে বাজারে পশু ছাড়ায় প্রতিযোগিতা বেড়ে যায় এবং দাম কমে যায়।
বাংলাদেশ ডেইরি অ্যান্ড ফ্যাটেনিং ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতাদের মতে, বাজারে তোলা মোট পশুর প্রায় ২০ শতাংশ অবিক্রীত থাকতে পারে। তারা বলছেন, গত বছরের তুলনায় উৎপাদন ব্যয় অনেক বেশি হলেও অধিকাংশ খামারি আগের বছরের কাছাকাছি দামে পশু বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। ঈদের একেবারে শেষ সময়ে দাম আরও নেমে যাওয়ায় লোকসানের পরিমাণ বেড়েছে।
এদিকে কোরবানির পর চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণ কার্যক্রম নিয়ে সরকার আশাবাদী অবস্থান জানিয়েছে। বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে ৫৬ লাখের বেশি পশুর চামড়া সংরক্ষণ করা হয়েছে, যা প্রাথমিক প্রত্যাশার চেয়েও বেশি। আগামী কয়েক দিনে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সরকার জানিয়েছে, চামড়া ক্রয় ও প্রক্রিয়াজাতকরণে কোনো স্থবিরতা দেখা দিলে প্রয়োজন হলে ‘ওয়েট ব্লু’ চামড়া রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হবে। একই সঙ্গে চামড়া শিল্পের আধুনিকায়নে নতুন পরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে।
এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিভাগীয় শহরগুলোতে আধুনিক কসাইখানা স্থাপনের চিন্তা করা হচ্ছে। সেখানে স্বাস্থ্যসম্মত ও পেশাদার পদ্ধতিতে পশু জবাই, চামড়া সংগ্রহ এবং মাংস প্রক্রিয়াজাত করা হবে। সংশ্লিষ্টদের বিশ্বাস, এতে একদিকে চামড়ার মান উন্নত হবে, অন্যদিকে শহরাঞ্চলে কোরবানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও আরও কার্যকর হবে।
ট্যানারি শিল্পের সক্ষমতা বাড়াতেও নতুন উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার। সাভারে স্থানান্তরিত ট্যানারিগুলোর প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক মান অর্জনে সহায়তা দেওয়া হবে। এর ফলে ভবিষ্যতে দেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি আয় আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ ও খাতবিশ্লেষকদের মতে, এবারের কোরবানির বাজার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, বাজারের প্রকৃত চাহিদা, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র বিবেচনায় রেখে পরিকল্পনা করতে হবে। অন্যথায় উৎপাদক, খামারি ও ব্যবসায়ীদের বড় অংশ প্রতি বছরই এমন আর্থিক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন।

