বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের অন্যতম লাভজনক কার্গো রুট ছিল লন্ডন–ঢাকা। যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশিদের মাধ্যমে প্রতি বছর এই রুটে বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহন হতো। তৈরি পোশাক, ওষুধ, রাসায়নিক পণ্য, জরুরি কুরিয়ারসহ নানা বাণিজ্যিক মালামাল পরিবহনে দীর্ঘদিন ধরে এটি একটি লাভজনক রুট হিসেবে পরিচিত ছিল।
কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ, প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতা এবং বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে এই বাজার ধীরে ধীরে বিমান থেকে সরে গিয়ে বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর হাতে চলে যায়। এতে কয়েক বছরে প্রায় ৬০০ কোটি টাকার রাজস্ব আয় হারিয়েছে রাষ্ট্রীয় এই সংস্থা। বিষয়টি নিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের নতুন পরিচালনা বোর্ড পুনর্গঠনের পর তদন্ত শুরু হয়েছে এবং ইতোমধ্যে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রীয় এয়ারলাইন্সের একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাজার হঠাৎ হারিয়ে যাওয়ার পেছনে দায়ীদের চিহ্নিত করা জরুরি। দ্রুত রুটটি পুনরায় সক্রিয় না করলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে। বেসামরিক বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। ইতোমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। পুরো বিষয়টি পর্যালোচনা চলছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পরিচালনা বোর্ডের সাবেক সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, এ ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্ত শুধু রাজস্ব ক্ষতিই বাড়ায় না, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতাও ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাঁর মতে, কেন এই বাজার নষ্ট হলো তা দ্রুত তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। তা না হলে লোকসান আরও বাড়বে।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, ব্রিটিশ–বাংলাদেশি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত জেএমজি কার্গো অ্যান্ড ট্রাভেলস লিমিটেড লন্ডন–ঢাকা রুটে বিমানের কার্গো বিক্রয় এজেন্ট হিসেবে ২০০৯ সাল থেকে কাজ করছিল। পরবর্তীতে ২০১৩ সালের ২২ অক্টোবর এবং ২০১৪ সালের ১৮ অক্টোবর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সঙ্গে দুটি পৃথক চুক্তি হয়। সেখানে কার্গো বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা পূরণে প্রণোদনার ব্যবস্থাও ছিল। তৎকালীন সময়ে প্রতিটি ফ্লাইটে গড়ে প্রায় ৮ টন পর্যন্ত কার্গো সরবরাহ করত জেএমজি। পরে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও সেটি কমিয়ে ৩ টনে নামিয়ে আনা হয়। এতে ধীরে ধীরে এই রুটে বিমানের কার্গো পরিবহন কমতে থাকে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, লন্ডন–ঢাকা রুটের লাভজনক বাজারে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ওঠে তৎকালীন রাজনৈতিক প্রভাবশালী একটি মহলের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, তাদের ঘনিষ্ঠ একটি প্রতিষ্ঠানের সুবিধা নিশ্চিত করতে জেএমজির পরিবহন কমিয়ে দেওয়া হয়। এ প্রক্রিয়ায় বিমানের লন্ডন অফিসের তৎকালীন কান্ট্রি ম্যানেজার হারুন খান যুক্ত ছিলেন বলেও সূত্র দাবি করে।
এর ধারাবাহিকতায় ২০২০ সালের ৩ আগস্ট জেএমজির সঙ্গে থাকা চুক্তি বাতিল করা হয়। একই সময়ে একটি তদন্ত দল লন্ডনে পাঠানো হলেও অভিযোগ রয়েছে, সেটি পক্ষপাতদুষ্টভাবে পরিচালিত হয় এবং জেএমজির সঙ্গে কোনো আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ করা হয়নি। পরে দেশে ফিরে একতরফা প্রতিবেদন দেওয়া হয়, যার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটিকে বাজার থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেন।
বিমানের অভ্যন্তরীণ নথি অনুযায়ী, ওই সিদ্ধান্তের পর ২০২৩ সাল পর্যন্ত রাজস্ব ক্ষতি দাঁড়ায় ৩০০ থেকে ৪০০ কোটি টাকার বেশি। বর্তমানে এই ক্ষতির পরিমাণ ৬০০ কোটি টাকারও বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিপণন বিভাগের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৮–১৯ অর্থবছরে এই রুটে কার্গো আয় ছিল ৪৭ দশমিক ৪৪ কোটি টাকা। এর বড় অংশ আসে জেএমজির মাধ্যমে। কিন্তু ২০২০ সালে চুক্তি বাতিলের পর ২০২০–২১ অর্থবছরে আয় নেমে আসে মাত্র ৫ দশমিক ৯৩ কোটি টাকায়। অর্থাৎ মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে প্রায় ৮৭ শতাংশ আয় কমে যায়।
একজন কর্মকর্তা জানান, কিছু কর্মকর্তার স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে বিমান এই ক্ষতির মুখে পড়ে। জেএমজিকে বাদ দেওয়ার পর লন্ডন–ঢাকা রুটের বড় অংশ দখল করে নেয় বিদেশি এয়ারলাইন্স। বর্তমানে কাতার এয়ারওয়েজ, এমিরেটস এবং টার্কিশ এয়ারলাইন্স এই বাজারের বড় অংশ পরিচালনা করছে। ফলে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশিরা এখন বাধ্য হয়ে এসব এয়ারলাইন্সের মাধ্যমে পণ্য পাঠাচ্ছেন।
জেএমজি কার্গোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনির আহমেদ বলেন, তারা দীর্ঘদিন প্রবাসীদের সেবা দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু বাদ দেওয়ার পর এই রুটের বাজার বিদেশি এয়ারলাইন্সের হাতে চলে গেছে, যা দেশের জন্য বড় ক্ষতি। তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ করা হলেও এখনো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

