রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট নিরসনে নির্মিত নতুন ১০ তলা আবাসিক হল উদ্বোধনের আগেই বিতর্কের মুখে পড়েছে। ভবনটির বিভিন্ন দেয়াল ও পিলারে ফাটল এবং কয়েকটি স্থানে পলেস্তারা খসে পড়ার ঘটনা সামনে আসায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ হল থেকে স্থানান্তরিত শিক্ষার্থীরা নতুন ভবনেও একই ধরনের সমস্যা দেখতে পেয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন।
সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দুটি পুরোনো আবাসিক হলকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে। এরপর সেখানকার কিছু শিক্ষার্থীকে অস্থায়ীভাবে নতুন নির্মিত ১০ তলা ভবনে থাকার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু সেখানে ওঠার পরই শিক্ষার্থীরা ভবনের বিভিন্ন অংশে ফাটল লক্ষ্য করেন। তাদের অভিযোগ, কিছু স্থানে মেরামতের চেষ্টা করা হলেও পরে আবারও পলেস্তারা খসে পড়েছে।
শিক্ষার্থীদের মতে, নতুন একটি ভবনে এমন সমস্যা স্বাভাবিক নয়। তাদের আশঙ্কা, এটি নির্মাণমান নিয়ে প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে। অনেকেই মনে করছেন, বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে কোনো বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি না হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই আবাসিক হল প্রকল্পের কাজ এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ক্যাম্পাসে আরও একটি বহুতল একাডেমিক ভবনের নির্মাণকাজও পরিচালনা করছে, যার ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৫৩ কোটি টাকা। ফলে নতুন ভবনে দেখা দেওয়া ত্রুটি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই আলোচনা শুরু হয়েছে।
এই আবাসিক হলের নির্মাণ কার্যক্রম শুরু হয় কয়েক বছর আগে। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর নির্মাণকাজ শুরু হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প শেষ করা সম্ভব হয়নি। একাধিকবার সময় বাড়ানোর পরও ভবনটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা যায়নি। এর মধ্যেই দেয়াল ও পিলারে ফাটল দেখা দেওয়ার ঘটনা প্রশাসনের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
হলে অবস্থানরত কয়েকজন শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, তারা এমন একটি ভবনে থাকতে চান যেখানে নিরাপত্তা নিয়ে কোনো ধরনের শঙ্কা থাকবে না। তাদের ভাষ্য, পুরোনো ভবনের ঝুঁকি থেকে রক্ষা পেতে নতুন হলে উঠলেও এখন নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দ্রুত ও স্বচ্ছ পদক্ষেপ প্রত্যাশা করছেন তারা।
তবে প্রকৌশল সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী এসব ফাটল ভবনের মূল কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত নাও হতে পারে। তাপমাত্রার পরিবর্তন, প্লাস্টারের সংকোচন-প্রসারণ কিংবা বিম ও দেয়ালের সংযোগস্থলে চাপের কারণেও এ ধরনের ফাটল দেখা দিতে পারে। তারপরও তারা ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছেন বলে জানিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল শাখা ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, ভবনের নিরাপত্তা নিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো বড় ঝুঁকির তথ্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তবুও বিস্তারিত কারিগরি মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ নির্ণয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব আবাসিক হলের নিরাপত্তা মূল্যায়নের পরিকল্পনাও করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণ করা হবে বলে প্রশাসন জানিয়েছে। যদি নির্মাণকাজে গাফিলতি বা অনিয়মের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সামনে এখন দুটি বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা, অন্যদিকে নতুন নির্মিত ভবনগুলোর নির্মাণমান নিয়ে তৈরি হওয়া প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব দেওয়া। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত কারিগরি পরীক্ষা এবং ফলাফল প্রকাশ করা হলে শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ অনেকটাই কমবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

