ঈদ শেষে রাজধানীমুখী মানুষের চোখে এখন এক অস্বস্তিকর চিত্র। ঢাকা–মাওয়া–ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ের দুই পাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে কোরবানির পশুর চামড়া। কোথাও স্তূপ করে রাখা, কোথাও মাটিচাপা দেওয়া, আবার কোথাও ফেলে দেওয়া হয়েছে নদীতেও। বাতাসে ভেসে আসছে পচা চামড়ার তীব্র দুর্গন্ধ—যা ঈদ-পরবর্তী যাত্রাকে আরও অস্বস্তিকর করে তুলছে।
প্রতি বছরের মতো এবারও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। ন্যায্য দাম না পেয়ে অনেকেই চামড়া বিক্রি না করে ফেলে দিয়েছেন বা নষ্ট হতে দিয়েছেন। প্রশ্ন উঠছে, কেন ঈদ এলেই কাঁচা চামড়ার বাজারে এই ভাঙন দেখা দেয়? কেন বছরের পর বছর একই সংকট ঘুরে ফিরে আসে?
এই সমস্যার শুরু নতুন নয়। ২০১৭ সালে বিষয়টি বড় আকারে আলোচনায় আসে, যখন হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরের প্রক্রিয়া চলছিল। তখনও দেশের বিভিন্ন এলাকায় চামড়া নষ্ট হয়ে পড়ে থাকার দৃশ্য গণমাধ্যমে উঠে আসে। প্রায় এক দশক পার হলেও পরিস্থিতির বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট একক কোনো কারণে নয়, বরং একাধিক সমস্যার সমন্বিত ফল।
ঈদের সময় অল্প কয়েক দিনের মধ্যে বাজারে বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া চলে আসে। কিন্তু সেই তুলনায় ক্রেতা ও ট্যানারির চাহিদা অনেক কম থাকে। ফলে সরবরাহ বেড়ে গেলে স্বাভাবিকভাবেই দাম পড়ে যায়।
এদিকে দেশের চামড়া শিল্প দীর্ঘদিন ধরে নানা কাঠামোগত সমস্যায় জর্জরিত। হাজারীবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তরের পর পরিবেশগত মান উন্নত করার লক্ষ্য থাকলেও কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার এখনো পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করছে না। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের চামড়ার গ্রহণযোগ্যতা প্রত্যাশিতভাবে বাড়েনি।
এই বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছেন বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন এর চেয়ারম্যান মো. শাহীন আহমেদ। তিনি বলেন, সাভারে স্থানান্তরের পর থেকেই চামড়া শিল্প দুর্বল হয়ে পড়েছে। বর্তমানে সাভারে ১১৫টির বেশি ট্যানারি চালু থাকলেও মাত্র কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক মানের সনদ অর্জন করেছে। এই সনদ না থাকলে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র এবং উন্নত এশিয়ার বাজারে প্রবেশ কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে বেশিরভাগ ট্যানারি উচ্চমূল্যের বাজার ধরতে পারে না।
ঢাকার পোস্তা এলাকার চামড়া ব্যবসায়ী মো. আনোয়ার হোসেন জানান, ট্যানারির চাহিদা কম থাকায় ব্যবসায়ীরাও বেশি দাম দিতে পারছেন না। সরকার নির্ধারিত দাম বাস্তবে সব সময় কার্যকর হয় না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশন এর সাধারণ সম্পাদক টিপু সুলতান বলেন, এ বছর প্রত্যাশার তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কম চামড়া সংগ্রহ হয়েছে। তার মতে, মূল সমস্যা হলো অর্থসংকট। ঈদের সময় বিপুল চামড়া কেনার মতো মূলধন অনেক ব্যবসায়ীর হাতে থাকে না।
বিশেষজ্ঞ মত অনুযায়ী, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু ইউসুফ বলেন, চামড়া শিল্প দীর্ঘদিন ধরে কম দাম, দুর্বল চাহিদা এবং রপ্তানি সম্ভাবনা কাজে লাগাতে না পারার একটি চক্রে আটকে আছে। পরিবেশগত মান ও সুশাসনের ঘাটতি দূর না হলে এই অবস্থার পরিবর্তন কঠিন।
তিনি আরও জানান, যেসব ট্যানারি আন্তর্জাতিক মানের সনদ পেয়েছে, তারা তুলনামূলক ভালো রপ্তানি আদেশ পাচ্ছে। কিন্তু বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি এর পরিচালক অধ্যাপক মো. মিজানুর রহমান বলেন, ২০১২ সালের পর আন্তর্জাতিক ক্রেতারা পরিবেশগত মান নিয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়ায় বাংলাদেশের চামড়া খাতে চাপ বাড়ে। তার মতে, কাঁচা চামড়ার দাম কমার পেছনে কারসাজি নয়, বরং ট্যানারিগুলোর দুর্বল চাহিদাই মূল কারণ। চাহিদা বাড়লে দামও স্বাভাবিকভাবে বাড়ত।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এর অতিরিক্ত সচিব ও রপ্তানি উইংয়ের প্রধান মো. আব্দুর রহিম খান বলেন, অনেক সময় অনভিজ্ঞ কসাইদের কারণে চামড়া কেটে বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে মান কমে গিয়ে দামও কমে যায়। আবার লবণ ছাড়া বা ঠিকভাবে সংরক্ষণ না করলেও একই সমস্যা দেখা দেয়।
খন্দকার আবদুল মুক্তাদির জানান, চামড়ার দামের পতনের পেছনে মূল কারণ শিল্প খাতের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা। তার মতে, ট্যানারি স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল, তবে পুরো বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া যথাযথ হয়নি।
তিনি আরও বলেন, সাভারের কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের সক্ষমতা দৈনিক ২৫ হাজার ঘনমিটার হলেও বর্তমানে তা প্রায় ১৪ থেকে ১৭ হাজার ঘনমিটারে সীমিত। অর্থাৎ এটি পুরো সক্ষমতার তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশে চলছে। মন্ত্রী আরও জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে ভালো দামের জন্য আন্তর্জাতিক মানের সনদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সনদ ছাড়া বড় ক্রেতাদের কাছে প্রবেশ কঠিন।
সব মিলিয়ে দেখা যায়, ঈদের পর চামড়া নিয়ে সংকটের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ—বিপুল সরবরাহ, কম চাহিদা, অর্থসংকট, সংরক্ষণের দুর্বলতা, আন্তর্জাতিক মান পূরণে ঘাটতি এবং শিল্প খাতের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা। বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা, এই সমস্যাগুলোর সমাধান না হলে প্রতি বছর ঈদের পর চামড়া নিয়ে একই সংকটের পুনরাবৃত্তি ঘটবে।

