দেশব্যাপী ব্যাপক টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনার পরও হামের সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য এবং বিভিন্ন জেলার হাসপাতাল সূত্রে জানা যাচ্ছে, অনেক এলাকায় এখনো নিয়মিত নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছে এবং হাসপাতালে ভর্তি বাড়ছে। ফলে টিকাদান অভিযানের কার্যকারিতা, কাভারেজ এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
হামের বিস্তার ঠেকাতে সরকার চলতি বছরের ৫ এপ্রিল ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ১৮ জেলার ৩০টি উপজেলা ও পৌর এলাকায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। পরে ৮ এপ্রিল চারটি সিটি করপোরেশন এলাকায় এবং ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশে এ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হয়। কর্মসূচির আওতায় ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের দাবি, লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে।
তবে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি বলছে, টিকা দেওয়ার কয়েক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও অনেক এলাকায় হামের সংক্রমণ পুরোপুরি থামেনি। পাবনা, বরগুনা, মাদারীপুর, নওগাঁ, যশোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় এখনো নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। কোথাও কোথাও রোগীর সংখ্যা কমলেও সংক্রমণের ধারা অব্যাহত রয়েছে।
পাবনার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে সোমবার পর্যন্ত ৫০ জন হাম আক্রান্ত রোগী ভর্তি ছিল। গত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে নতুন করে ১২ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি চালানো হলেও আক্রান্তের সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি দেখা গেছে। স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, গত প্রায় দুই সপ্তাহে সেখানে নতুন কোনো হাম রোগী ভর্তি হয়নি। তবে দেশের অধিকাংশ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এমন চিত্র দেখা যাচ্ছে না।
বরগুনা সদর হাসপাতালে গত আট দিনে ৪০ জন শিশু হাম নিয়ে ভর্তি হয়েছে। জেলায় নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা কয়েক ডজন ছাড়িয়েছে এবং শত শত শিশুর মধ্যে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে সেখানে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, জনগোষ্ঠীর বড় অংশের মধ্যে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হতে আরও সময় লাগবে।
মাদারীপুরেও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি বজায় রয়েছে। গত কয়েক দিনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। জেলায় এ রোগে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। একইভাবে নওগাঁর পোরশা উপজেলা এবং জেলা সদর হাসপাতালেও নতুন রোগী ভর্তি হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে সংক্রমণের গতি কিছুটা কমলেও হাসপাতালগুলোতে এখনো রোগী আসছে। গত কয়েক দিনে শত শত শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, বর্তমানে দুই মাস থেকে এক বছর বয়সী শিশুরা তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ১ হাজার ১৩৪ জন হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। একই সময়ে তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। নতুন করে ৪৫ জনের মধ্যে হাম নিশ্চিত করা হয়েছে। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত ৭২ হাজারের বেশি মানুষ হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে এবং ৯ হাজারের বেশি রোগীর ক্ষেত্রে সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে।
মৃত্যুর সংখ্যাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। চলতি বছর হাম ও হামসদৃশ উপসর্গে মোট ৫৮৮ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৯০ জনের ক্ষেত্রে পরীক্ষার মাধ্যমে হাম নিশ্চিত হয়েছিল।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু টিকা প্রদানই যথেষ্ট নয়; টিকাদান কর্মসূচির প্রকৃত কাভারেজ, টিকার কার্যকারিতা এবং আক্রান্ত এলাকায় প্রতিরোধক্ষমতা কতটা তৈরি হয়েছে, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করা জরুরি। তাঁদের মতে, হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে আনতে সাধারণত অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষের মধ্যে কার্যকর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা থাকা প্রয়োজন। কোনো এলাকায় এ হার অর্জিত না হলে সংক্রমণ দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আরেকটি পর্যবেক্ষণ হলো, টিকা নেওয়ার পর শরীরে পর্যাপ্ত প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হতে সাধারণত দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগে। কিন্তু বর্তমানে টিকা পাওয়া শিশুদের মধ্যে অ্যান্টিবডি কতটা তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো জাতীয় পর্যায়ের মূল্যায়ন কার্যক্রম দৃশ্যমান নয়। ফলে সংক্রমণ অব্যাহত থাকার প্রকৃত কারণ নির্ধারণও কঠিন হয়ে পড়ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সামগ্রিকভাবে সংক্রমণের প্রবণতা আগের তুলনায় কমেছে এবং আগামী কয়েক সপ্তাহে পরিস্থিতি আরও উন্নতির দিকে যেতে পারে। তবে হাম পুরোপুরি কখন নিয়ন্ত্রণে আসবে, সে বিষয়ে এখনই নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
দুই মাসের বেশি সময় ধরে চলা এই পরিস্থিতি এখন দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচির পরও যদি বিভিন্ন এলাকায় নতুন রোগী শনাক্ত হতে থাকে, তাহলে আক্রান্ত অঞ্চলগুলোতে অতিরিক্ত নজরদারি, টিকাদানের মান যাচাই এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে দ্রুত সুরক্ষার আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়ে যাবে।

