চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুর যেন রাষ্ট্রের ভেতরে আরেকটি বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ড। বছরের পর বছর ধরে পাহাড় কাটা, সরকারি জমি দখল, প্লট বাণিজ্য এবং সশস্ত্র আধিপত্যের মাধ্যমে গড়ে ওঠা এক জটিল ক্ষমতার বলয়ে পরিণত হয়েছে এলাকাটি। সম্প্রতি যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে সংঘবদ্ধ হামলার ঘটনার পর আবারও আলোচনায় এসেছে এই দুর্গম জনপদ। প্রশ্ন উঠেছে—কাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে জঙ্গল সলিমপুর এবং কীভাবে এত বড় সশস্ত্র নেটওয়ার্ক গড়ে উঠল সেখানে?
গত ২৪ মে গভীর রাতে আলীনগর এলাকায় যৌথ বাহিনীর একটি ক্যাম্পে বড় ধরনের হামলা চালানো হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক শ সশস্ত্র ব্যক্তি পরিকল্পিতভাবে হামলায় অংশ নেয়। হামলার সময় স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবহার করা হয় এবং নির্মাণাধীন একটি নিরাপত্তা ক্যাম্প বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলা হয়। এছাড়া বাহিনীর চলাচল ব্যাহত করতে কয়েকটি সড়কও ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়।
এই ঘটনার পর ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করা হলেও হামলার মূল পরিকল্পনাকারী এবং প্রভাবশালী সন্ত্রাসী নেতাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তাদের দাবি, অভিযানের খবর আগেই পেয়ে যায় সন্ত্রাসীরা এবং দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে পড়ে।
চট্টগ্রাম নগরের উপকণ্ঠে অবস্থিত জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পাহাড়বেষ্টিত দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এখানে সহজে প্রবেশ করা যায় না। স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকায় প্রবেশ ও অবস্থানের ক্ষেত্রেও অঘোষিত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো নিজেদের শক্ত ঘাঁটি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, এলাকায় মূলত দুটি প্রভাবশালী সশস্ত্র পক্ষ সক্রিয়। এক পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন ইয়াসিন, অন্য পক্ষে রোকন উদ্দিন। উভয় পক্ষেরই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অনুসারী রয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতারা প্রকাশ্যে এসব গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক অস্বীকার করেছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে। বিশেষ করে সরকারি খাসজমি দখল, পাহাড় কাটা এবং প্লট বিক্রিকে কেন্দ্র করে সংঘাতের মাত্রা বেড়েছে। এসব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকেই বিপুল অঙ্কের অর্থ প্রবাহ তৈরি হয়েছে, যা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর শক্তি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় কয়েক হাজার একর খাসজমি রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে এসব জমির বড় অংশ অবৈধভাবে দখল করে প্লট আকারে বিক্রি করা হচ্ছে। বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে পাহাড় কেটে নতুন নতুন আবাসন এলাকা তৈরি করা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রতিদিন পাহাড় কাটার জন্য আলাদা অর্থ আদায় করা হয় এবং সেই অর্থের একটি অংশ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হাতে যায়।
এলাকাটিতে অপরাধচক্রের প্রভাব নতুন নয়। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, নব্বইয়ের দশক থেকে ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো এখানে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে শুরু করে। সময়ের সঙ্গে নেতৃত্ব বদলেছে, কিন্তু দখল ও আধিপত্যের সংস্কৃতি থেকে গেছে। বর্তমানে কয়েকটি বড় ও ছোট সশস্ত্র গ্রুপ এলাকায় সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপর একাধিক হামলার ঘটনাও জঙ্গল সলিমপুরকে আলোচনায় এনেছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে অভিযানে গিয়ে এক র্যাব কর্মকর্তা নিহত হন। এর আগে বিভিন্ন উচ্ছেদ অভিযান এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার সময়ও হামলার শিকার হয়েছেন সরকারি কর্মকর্তারা। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে এলাকাটিতে দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখে ছিল।
চলতি বছরের মার্চে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির সমন্বয়ে বড় ধরনের অভিযান চালিয়ে এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়। অভিযানে কয়েকজনকে আটক করা হলেও শীর্ষ পর্যায়ের অনেক অভিযুক্ত ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান। পরে নিরাপত্তা চৌকি স্থাপন করা হলেও সাম্প্রতিক হামলা দেখিয়েছে যে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর সক্ষমতা পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া সম্ভব হয়নি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক সফরের পর সরকার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে জঙ্গল সলিমপুরকে আর সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে থাকতে দেওয়া হবে না। এলাকাটিতে স্থায়ীভাবে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়ন এবং অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে নয়, ভূমি ব্যবস্থাপনা, অবৈধ প্লট বাণিজ্য বন্ধ, পাহাড় রক্ষা এবং স্থানীয় জনগণের জন্য কার্যকর প্রশাসনিক উপস্থিতি নিশ্চিত করার মাধ্যমেই জঙ্গল সলিমপুরে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। অন্যথায় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পুনরুত্থানের ঝুঁকি থেকেই যাবে।
সাম্প্রতিক হামলার ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, জঙ্গল সলিমপুরের সংকট কেবল আইনশৃঙ্খলার নয়; এটি ভূমি, অর্থনীতি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক দুর্বলতার সমন্বয়ে তৈরি একটি জটিল বাস্তবতা। সেই বাস্তবতার স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

