মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের জন্য স্বস্তির খবর আসতে পারে আগামী জাতীয় বাজেটে। দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত সিম রিপ্লেসমেন্ট কর বাতিলের বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, মোবাইল সিম প্রতিস্থাপনের ওপর বর্তমানে যে কর আরোপ করা রয়েছে, তা প্রত্যাহারের প্রস্তাব বিবেচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে আইওটি বা ইন্টারনেট অব থিংস সিমের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।
বর্তমানে কোনো গ্রাহক তার পুরোনো নম্বর অক্ষুণ্ন রেখে নতুন সিম নিতে চাইলে তাকে ২০০ টাকা কর পরিশোধ করতে হয়। মোবাইল ফোন হারিয়ে গেলে, সিম নষ্ট হয়ে গেলে কিংবা প্রযুক্তিগত কারণে সিম পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে এই কর প্রযোজ্য হয়। ফলে সাধারণ গ্রাহকদের জন্য এটি একটি অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ব্যবসা সহজীকরণ এবং ডিজিটাল খাতের উন্নয়নের লক্ষ্যে এই কর প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকেও এ বিষয়ে ইতিবাচক নির্দেশনা এসেছে বলে জানা গেছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে আগামী বাজেটের অর্থ বিলে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে কর প্রত্যাহার করা হলে সরকারের রাজস্ব আয়ে কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, সিম প্রতিস্থাপনের ওপর আরোপিত কর থেকে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব আসে। এই কর তুলে দেওয়া হলে প্রায় ১৩০ কোটি টাকার রাজস্ব ছাড় দিতে হতে পারে।
অন্যদিকে মোবাইল ফোন অপারেটরগুলো এ উদ্যোগকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। তাদের যুক্তি, একটি সিম প্রথমবার কেনার সময় গ্রাহক কর পরিশোধ করেন। পরে একই নম্বরের সিম পুনরায় ইস্যুর সময় আবার কর নেওয়া হলে সেটি কার্যত দ্বৈত করের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। তাই দীর্ঘদিন ধরেই তারা এই কর প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছিল।
খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর প্রায় ৬৫ লাখ সিম প্রতিস্থাপন করা হয়। ফলে কর প্রত্যাহার হলে বিপুলসংখ্যক গ্রাহক সরাসরি উপকৃত হবেন। বিশেষ করে মোবাইল ফোন হারানো বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে যাদের বারবার সিম পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়, তাদের জন্য এটি বড় স্বস্তি বয়ে আনবে।
আইওটি সিমের ক্ষেত্রেও কর প্রত্যাহারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। স্মার্ট ডিভাইস, সেন্সর, শিল্পকারখানার স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি এবং বিভিন্ন ডিজিটাল অবকাঠামোতে ব্যবহৃত এই সিম দেশের প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কর কমানো বা প্রত্যাহার করা হলে এই খাতে নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত মোবাইল সংযোগের সংখ্যা ১৮ কোটিরও বেশি। যদিও একজন গ্রাহকের নামে একাধিক সিম নিবন্ধিত থাকতে পারে, তবুও মোবাইল যোগাযোগ খাত বর্তমানে দেশের অন্যতম বৃহৎ ডিজিটাল অবকাঠামো হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রতিবছর কোটি কোটি নতুন সিম বিক্রি হচ্ছে এবং এ খাত থেকে সরকার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্বও পাচ্ছে।
টেলিযোগাযোগ খাতের বিশ্লেষকদের মতে, সিম রিপ্লেসমেন্ট কর প্রত্যাহার করলে সরকারের রাজস্ব কিছুটা কমলেও দীর্ঘমেয়াদে গ্রাহকসেবা উন্নয়ন, ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি এবং বিনিয়োগ পরিবেশের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এতে অপারেটরগুলোও গ্রাহকবান্ধব সেবা আরও সহজে সম্প্রসারণের সুযোগ পাবে।
মোবাইল অপারেটরদের প্রতিনিধিরা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে এবং টেলিযোগাযোগ খাতের প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে। তাদের মতে, কর কাঠামোকে আরও যৌক্তিক ও আধুনিক করা গেলে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশও দ্রুত হবে।
এখন বাজেট ঘোষণার দিকে তাকিয়ে আছে টেলিযোগাযোগ খাতের প্রতিষ্ঠান, বিনিয়োগকারী এবং কোটি কোটি মোবাইল ব্যবহারকারী। প্রস্তাবটি চূড়ান্ত অনুমোদন পেলে সিম প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের একটি আর্থিক বাধা দূর হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

