বাংলাদেশের রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নাম তোফায়েল আহমেদ। ছাত্র আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্রের সংগ্রাম এবং আওয়ামী লীগের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এই বর্ষীয়ান নেতা ৮১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছেন। জীবনের শেষ সময়ে তিনি বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
ষাটের দশকের শেষভাগে ছাত্ররাজনীতির উত্থানপর্বে তোফায়েল আহমেদ জাতীয়ভাবে পরিচিতি লাভ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা হিসেবে তিনি উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে সামনের সারির নেতৃত্ব দেন। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালির রাজনৈতিক জাগরণ আরও শক্তিশালী হয়। পরবর্তীতে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম সংগঠক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই তিনি আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে অংশ নেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নয়বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে দেশের অন্যতম অভিজ্ঞ সংসদ সদস্যদের কাতারে স্থান করে নেন তিনি।
রাজনীতির বিভিন্ন পর্যায়ে মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তোফায়েল আহমেদ। শিল্প ও বাণিজ্য খাতের দায়িত্বে থেকে তিনি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার অংশ ছিলেন। জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতা একসময় এতটাই শক্তিশালী ছিল যে আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে তাকে বিবেচনা করা হতো।
তবে রাজনৈতিক জীবনের শেষ অধ্যায় ছিল তুলনামূলকভাবে ভিন্ন। দলের অভ্যন্তরীণ সমীকরণ এবং নেতৃত্বের সঙ্গে দূরত্বের কারণে ধীরে ধীরে তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে আগের অবস্থান হারান। একসময় যিনি দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে ছিলেন, পরবর্তী সময়ে তাঁকে অনেকটা প্রান্তিক অবস্থানে দেখা যায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলের ভেতরের নানা পরিবর্তন, নেতৃত্বের সঙ্গে মতপার্থক্য এবং অতীতের কিছু রাজনৈতিক অবস্থান তাঁর প্রভাব কমে যাওয়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছিল। বিশেষ করে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আওয়ামী লীগের সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিত কিছু নেতার সঙ্গে তাঁর নাম আলোচনায় আসার পর দলীয় রাজনীতিতে তাঁর অবস্থান আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।
তবে রাজনৈতিক অবস্থান যাই হোক, তোফায়েল আহমেদ কখনও আওয়ামী লীগের বাইরে যাননি। নানা মতবিরোধ ও হতাশা সত্ত্বেও তিনি দলেই থেকে গেছেন এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতি নিজের অঙ্গীকার বজায় রেখেছেন বলে তাঁর ঘনিষ্ঠজনরা মনে করেন।
ব্যক্তিগত জীবনেও শেষ কয়েক বছর ছিল কঠিন। স্ট্রোকজনিত কারণে তিনি শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন এবং হুইলচেয়ারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে যান। তবুও দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং নিজের নির্বাচনী এলাকার খোঁজখবর রাখতেন বলে পরিবার ও সহকর্মীরা জানিয়েছেন।
উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম নেতা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, বহুবারের সংসদ সদস্য এবং সাবেক মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি যুগের অবসান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তাঁর রাজনৈতিক জীবনে যেমন সাফল্য ও প্রভাব ছিল, তেমনি শেষ সময়ে ছিল ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দূরে সরে যাওয়ার বাস্তবতাও। সেই দুই বিপরীত অভিজ্ঞতাই তাঁকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে স্মরণীয় করে রাখবে।

