রাজধানীর মিরপুরে এক হৃদয়বিদারক ঘটনায় নিজ বাসা থেকে ৭৫ বছর বয়সী এক বৃদ্ধার পচনধরা মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা এবং দীর্ঘদিনের অবহেলার অভিযোগে ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, মিরপুর-১১ এলাকার একটি ফ্ল্যাটে বৃদ্ধা নুরজাহান বেগম তার স্কুলশিক্ষিকা মেয়ের সঙ্গে বসবাস করতেন। গত ৩১ মে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে পুলিশ তার মরদেহ উদ্ধার করে। মরদেহে পচন ধরেছিল এবং সেখানে পোকাও দেখা যায়, যা থেকে ধারণা করা হচ্ছে তিনি কয়েকদিন আগেই মারা গিয়েছিলেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বৃদ্ধার তিন সন্তান রয়েছে। তাদের মধ্যে একজন সরকারের একজন যুগ্ম সচিব এবং আরেকজন একটি স্বনামধন্য প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তবে দুই ছেলে দীর্ঘদিন ধরে আলাদা থাকতেন এবং মায়ের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল না বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, বৃদ্ধার মেয়ে একই বাসার পাশের কক্ষে থাকলেও মায়ের মৃত্যুর বিষয়টি কাউকে জানাননি। পুলিশ ধারণা করছে, তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ বা বিপর্যস্ত অবস্থায় থাকতে পারেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে গিয়ে তারা অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ দেখতে পান। পুরো বাসাজুড়ে ময়লা-আবর্জনা ছড়িয়ে ছিল, দুর্গন্ধে ভরা ছিল ঘরগুলো। এমন পরিস্থিতিতে বৃদ্ধার মরদেহ দীর্ঘ সময় পড়ে থাকলেও পরিবারের কেউ বিষয়টি বুঝতে পারেননি বা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেননি।
বৃদ্ধার দেখাশোনার জন্য সম্প্রতি একজন নার্সকে ডাকা হয়েছিল। তিনি বাসায় এসে বৃদ্ধাকে মৃত অবস্থায় দেখতে পান এবং পরে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে বিষয়টি জানান। এরপর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়।
পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং স্বজনরা দাফন সম্পন্ন করেছেন। এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করা হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তারা আরও জানান, পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও যোগাযোগের ঘাটতির বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। একজন ছেলের কাছে অন্য ভাইয়ের বর্তমান মোবাইল নম্বর জানতে চাইলে তিনি বহু বছর আগে অচল হয়ে যাওয়া একটি নম্বর দিয়েছেন। এতে ধারণা করা হচ্ছে, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে যোগাযোগের সংকট ছিল।
সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনাটি শুধু একটি মৃত্যুর ঘটনা নয়; বরং নগরজীবনে পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, প্রবীণদের প্রতি অবহেলা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। পরিবারের সদস্যরা উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত হওয়া সত্ত্বেও একজন বৃদ্ধা মায়ের এমন করুণ পরিণতি সমাজের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে।

