দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পদত্যাগের পর থেকে সংস্থাটির কার্যক্রমে বড় ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগ গ্রহণ, মামলা দায়ের, চার্জশিট দাখিল এবং অর্থসম্পদ অবরুদ্ধ ও ক্রোক করার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এখন কার্যত বন্ধ রয়েছে।
গত ৩ মার্চ কমিশন পদত্যাগ করে। এরপর প্রায় তিন মাস ধরে পুরোনো অভিযোগগুলোর অনুসন্ধান ও মামলার তদন্ত সীমিত আকারে চললেও আইনি জটিলতার কারণে পুরো প্রতিষ্ঠানে কার্যত অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে।
তবে সরকার ইতোমধ্যে কমিশন পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের জন্য একটি বাছাই কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। এ অংশ হিসেবে গত ২৪ মে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ প্রধান বিচারপতির কাছে একটি চিঠি পাঠায়। সেখানে আপিল বিভাগের একজন বিচারপতিকে সভাপতি এবং হাইকোর্ট বিভাগের একজন বিচারপতিকে সদস্য হিসেবে মনোনয়নের অনুরোধ করা হয়।
এই দুই নাম পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী পাঁচ সদস্যের বাছাই কমিটি গঠন করা হবে। পরে এই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি তিনজন কমিশনার নিয়োগ দেবেন। তাদের মধ্য থেকে একজন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পাবেন এবং তিন সদস্যের নতুন কমিশন গঠিত হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আইনে কমিশন পদত্যাগের ৩০ দিনের মধ্যে পুনর্গঠনের কথা বলা থাকলেও নির্দিষ্ট বিকল্প নির্দেশনা নেই। ফলে শেষ পর্যন্ত সরকারের সিদ্ধান্তই এখানে চূড়ান্ত ভূমিকা রাখবে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বাছাই কমিটির অপর তিন সদস্য নির্ধারিত থাকবেন। তারা হলেন মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান এবং সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত মন্ত্রিপরিষদ সচিব। প্রয়োজনে নির্দিষ্ট শর্তে আগের বা বর্তমান সচিবকেও অন্তর্ভুক্ত করার বিধান রয়েছে।
বাছাই কমিটি প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে দুজন করে প্রার্থী নির্বাচন করে রাষ্ট্রপতির কাছে তালিকা জমা দেবে। পাঁচ সদস্যের মধ্যে চারজন উপস্থিত থাকলে কোরাম পূর্ণ হবে। কমিশন পদত্যাগের সময় যাচাই-বাছাই কমিটিতে কয়েক হাজার অভিযোগ ঝুলে ছিল। অনুসন্ধানের সুপারিশ হলেও কমিশন না থাকায় সেগুলোর বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এদিকে মার্চ মাস থেকে প্রতিদিনই শত শত নতুন অভিযোগ জমা পড়ছে। সাবেক ও বর্তমান বিভিন্ন সরকারি দায়িত্বশীল ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ আসছে। এর মধ্যে দুর্নীতি, হয়রানি ও ঘুষের অভিযোগও রয়েছে।
বিআরটিএ, পাসপোর্ট অফিস, ভূমি অফিস, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, হাসপাতাল, সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন দপ্তরে দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়ছে। অনেকেই ১০৬ নম্বরে ফোন করেও অভিযোগ জানাচ্ছেন। রাজধানীর সেগুনবাগিচার প্রধান কার্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ জমা হচ্ছে। কিন্তু কমিশন না থাকায় এসব অভিযোগের ওপর কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
তবে দুদকের জনসংযোগ বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, পুরোনো কমিশনের অনুমোদিত তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তারা তথ্য সংগ্রহ ও জিজ্ঞাসাবাদ চালিয়ে যাচ্ছেন। নতুন অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই কমিটিতে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। নতুন কমিশন গঠনের পর সেগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
দুদকের একাধিক কর্মকর্তা জানান, যেসব মামলার অনুসন্ধান বা তদন্ত শেষ হয়েছে, সেগুলোর মামলা ও চার্জশিট দাখিলের জন্য কমিশনের অনুমোদন প্রয়োজন। কমিশন না থাকায় এ কাজও আটকে আছে। অন্যদিকে কিছু কর্মকর্তা ইচ্ছাকৃতভাবে তদন্ত ও অনুসন্ধানের কাজ থামিয়ে রেখেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। তাদের মতে, চাইলে এসব কার্যক্রম চলমান রাখা সম্ভব হলেও তা করা হচ্ছে না। সব মিলিয়ে কমিশন শূন্য অবস্থায় দুদকের স্বাভাবিক কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। নতুন কমিশন গঠন না হওয়া পর্যন্ত এই সংকটের সমাধান অনিশ্চিত।

