চট্টগ্রামের বিচারপ্রার্থীদের হয়রানি, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অনিয়মের তথ্য সরাসরি জানার জন্য নতুন উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। বিচারসেবা আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং জনবান্ধব করতে আদালত প্রাঙ্গণে বিশেষ অভিযোগ বক্স স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে নাগরিকরা বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ লিখিতভাবে জমা দিতে পারবেন।
মঙ্গলবার চট্টগ্রাম চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এ জি এম মনিরুল হাসান সরকারের উদ্যোগে আদালত চত্বরে ‘সিএমএম, চট্টগ্রাম সমীপে’ নামে এই অভিযোগ বক্স স্থাপন করা হয়। আদালত প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিচারপ্রার্থীদের অভিজ্ঞতা, অভিযোগ এবং অনিয়মের তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে বিচার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়ানোই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
আদালত প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ২৫ ধারা অনুসারে চট্টগ্রাম চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ‘জাস্টিস অব দ্য পিস’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেই ক্ষমতার আওতায় বিচার প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, সরকারি সেবায় অনিয়ম প্রতিরোধ এবং নাগরিকদের অভিযোগ গ্রহণের জন্য এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম মহানগর এলাকার যেকোনো নাগরিক কিংবা বিচারপ্রার্থী এই অভিযোগ বক্স ব্যবহার করতে পারবেন। বিশেষ করে পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়ায় হয়রানি, আদালতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অসদাচরণ, ঘুষ দাবি, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা সেবা প্রদানে অনিয়মের মতো বিষয়গুলো অভিযোগ আকারে জমা দেওয়া যাবে। এছাড়া বিচারসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে যেকোনো ধরনের দুর্ভোগ বা অনিয়মের তথ্যও কর্তৃপক্ষকে জানানো সম্ভব হবে।
তবে আদালত কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করেছে, এই অভিযোগ বক্স নিয়মিত বিচারিক প্রক্রিয়ার বিকল্প নয়। এর মাধ্যমে কোনো মামলা দায়ের বা এজাহার গ্রহণ করা হবে না। বরং প্রাপ্ত অভিযোগ ও তথ্য যাচাই-বাছাই করে যদি তা বিশ্বাসযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হয়, তাহলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক বা বিচারিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
আদালত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিচারপ্রার্থীরা অনেক সময় ভয়, সংকোচ কিংবা প্রভাবশালী মহলের চাপে অনিয়মের বিষয়ে প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে পারেন না। অভিযোগ বক্স চালুর ফলে তারা নিরাপদ ও গোপনীয় উপায়ে তথ্য জানাতে পারবেন, যা বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করতে এবং সেবার মান উন্নয়নে সহায়ক হবে।
এদিকে অভিযোগ ব্যবস্থার অপব্যবহার ঠেকাতেও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে আদালত। কোনো ব্যক্তি যদি অসৎ উদ্দেশ্যে মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধেও প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
লিখিত অভিযোগ সরাসরি আদালত ভবনে স্থাপিত অভিযোগ বক্সে জমা দেওয়ার পাশাপাশি অনলাইনেও পাঠানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। এতে বিচারপ্রার্থীদের অংশগ্রহণ আরও সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আদালত কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অভিযোগকারীর পরিচয়, তথ্যের গোপনীয়তা এবং নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে রক্ষা করা হবে।
আইন সংশ্লিষ্টদের মতে, বিচারব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর ক্ষেত্রে এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নাগরিকদের অভিযোগ গ্রহণ ও দ্রুত প্রতিকারের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হলে আদালতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে দুর্নীতি ও হয়রানির বিরুদ্ধে কার্যকর নজরদারি গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও এই উদ্যোগ ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

