স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত ও ব্যক্তি-নির্ভর প্রতিযোগিতার আওতায় আনার উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের পথে এগোচ্ছে নির্বাচন কমিশন। নতুন খসড়া বিধিমালা অনুযায়ী, আইনগত যোগ্যতা পূরণ করলে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত কিংবা অন্য যেকোনো রাজনৈতিক দলের নেতা, কর্মী, সমর্থক অথবা সাধারণ নাগরিক—সবাই দলীয় প্রতীক ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন।
বুধবার নির্বাচন কমিশন সংশোধিত নির্বাচন বিধিমালা ও আচরণবিধির খসড়া চূড়ান্ত করেছে। কমিশন জানিয়েছে, খুব শিগগিরই খসড়াটি জনসাধারণের মতামতের জন্য তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নাগরিক, রাজনৈতিক দল, নির্বাচনবিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা এ বিষয়ে মতামত বা আপত্তি জানাতে পারবেন। উল্লেখযোগ্য কোনো আপত্তি না এলে পরবর্তী ধাপে বিধিমালাটি চূড়ান্ত করা হবে।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, সম্প্রতি স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীক ছাড়া আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ভিত্তি তৈরি হওয়ার পর বিভিন্ন নির্বাচন বিধিমালায় সংশোধনের কাজ শুরু হয়। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও অন্যান্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনকে নতুন কাঠামোর আওতায় আনতেই এসব পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
খসড়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বরং আইনগত যোগ্যতাই হবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রধান শর্ত। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও শুধু সেই পরিচয়ের কারণে তাঁকে নির্বাচনের বাইরে রাখা হবে না। নির্বাচনে অংশ নিতে হলে তাঁকে কেবল প্রচলিত আইনের নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করতে হবে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেছেন, সংশোধিত আচরণবিধিতে কোনো রাজনৈতিক দলকে আলাদাভাবে বাদ দেওয়ার মতো বিধান রাখা হয়নি। যেহেতু স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীক ছাড়া অনুষ্ঠিত হবে, তাই প্রার্থীর রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে তাঁর যোগ্যতা ও আইনি অবস্থানই বিবেচনায় আসবে। তাঁর ভাষায়, কোনো ব্যক্তি আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত বা অন্য যে দলেরই সমর্থক হোন না কেন, যদি তিনি আইনি শর্ত পূরণ করেন, তাহলে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিধান কার্যকর হলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের চরিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় নির্বাচন দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হওয়ায় জাতীয় রাজনীতির প্রভাব স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করেছিল। নতুন ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, স্থানীয় জনপ্রিয়তা এবং উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের গুরুত্ব বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে সমালোচকদের একটি অংশ মনে করছেন, দলীয় প্রতীক না থাকলেও রাজনৈতিক পরিচয় পুরোপুরি আড়াল করা সম্ভব হবে না। কারণ স্থানীয় পর্যায়ের ভোটাররা সাধারণত প্রার্থীদের রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে অবগত থাকেন। ফলে নির্বাচন আনুষ্ঠানিকভাবে নির্দলীয় হলেও বাস্তবে রাজনৈতিক প্রভাব কিছুটা থেকে যেতে পারে।
খসড়ায় শুধু প্রার্থী হওয়ার শর্ত নয়, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাবও রাখা হয়েছে। এর মধ্যে অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার ব্যবস্থা বাতিলের সুপারিশ রয়েছে। একই সঙ্গে ডাকযোগে ভোট বা পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থাও নতুন বিধিমালায় রাখা হয়নি।
নির্বাচন কমিশনের মতে, বিদ্যমান বাস্তবতা ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বিবেচনায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে প্রার্থীদের সরাসরি নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের কাছে মনোনয়নপত্র জমা দিতে হবে এবং ভোটগ্রহণ প্রচলিত পদ্ধতিতেই পরিচালিত হবে।
খসড়ায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটাধিকার বাস্তবায়নের জন্যও কোনো নতুন ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়নি। ফলে দেশের বাইরে অবস্থানরত ভোটারদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে আগের অবস্থানই বহাল থাকছে।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, জনমত গ্রহণের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর খসড়ায় আরও কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। তবে বর্তমান প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনার কাঠামো, প্রার্থী নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ধরনে নতুন বাস্তবতা তৈরি হবে। এখন নজর থাকবে জনমত পর্বের দিকে। রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত বিধিমালা কতটা পরিবর্তিত হয়, সেটিই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের রূপরেখা।

