যুদ্ধবিধ্বস্ত এক নবজাত রাষ্ট্র থেকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার পথে বাংলাদেশের বাজেটও পেরিয়েছে দীর্ঘ ও নাটকীয় এক রূপান্তরের ইতিহাস। স্বাধীনতার পর যে দেশ মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকার বাজেট নিয়ে পথচলা শুরু করেছিল, সেই দেশ আজ সাড়ে ৯ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি বাজেট প্রণয়নের সক্ষমতা অর্জন করেছে। সংখ্যার এই বিস্ময়কর উত্থান শুধু অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধির গল্প নয়; এটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, উৎপাদনশীলতা, রাজস্ব আহরণ এবং উন্নয়ন অভিযাত্রারও প্রতিচ্ছবি।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৩০ জুন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করেন তৎকালীন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। সদ্য স্বাধীন দেশের সামনে তখন ছিল পুনর্গঠন, পুনর্বাসন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক কাঠামো পুনরুদ্ধারের মতো কঠিন চ্যালেঞ্জ। সে সময় উপস্থাপিত বাজেটের আকার ছিল মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকা, যার বড় অংশই বৈদেশিক সহায়তা, অনুদান ও ঋণের ওপর নির্ভরশীল ছিল।
স্বাধীনতার পরবর্তী বছরগুলোতে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হতে শুরু করে। কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকারের ব্যয় ও উন্নয়ন পরিকল্পনার পরিধিও বিস্তৃত হয়। এর প্রতিফলন দেখা যায় বাজেটের আকারে।
১৯৭৫-৭৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের বাজেট প্রথমবারের মতো এক হাজার কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করে। সে সময় বাজেটের আকার দাঁড়ায় ১ হাজার ৫৪৯ কোটি টাকা। এটি ছিল স্বাধীনতার পর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির প্রতীক।
পরবর্তী দেড় দশকে অর্থনীতির পরিধি আরও বাড়তে থাকে। শিল্পায়ন, বৈদেশিক বাণিজ্য এবং সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের ফলে ১৯৯০-৯১ অর্থবছরে জাতীয় বাজেট প্রথমবার ১০ হাজার কোটি টাকার গণ্ডি পেরিয়ে যায়। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি ছিল বাংলাদেশের রাজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
এরপর শুরু হয় আরও দ্রুত সম্প্রসারণের যুগ। তৈরি পোশাক শিল্পের বিকাশ, প্রবাসী আয় বৃদ্ধি, কৃষি উৎপাদনে সাফল্য, বেসরকারি খাতের বিকাশ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন দেশের অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। এর ফল হিসেবে ২০০৯-১০ অর্থবছরে বাংলাদেশের বাজেট প্রথমবারের মতো ১ লাখ কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করে। ওই অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল ১ লাখ ১৩ হাজার ৮১৫ কোটি টাকা।
বিশ্লেষকদের মতে, লাখ কোটি টাকার বাজেটে পৌঁছানো ছিল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। কারণ এটি প্রমাণ করে যে দেশটি শুধু টিকে থাকার সংগ্রাম থেকে বেরিয়ে এসে বৃহৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সক্ষমতা অর্জন করেছে।
পরবর্তী এক দশকে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণের ফলে বাজেটের আকার আরও দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাতীয় বাজেটের আকার পৌঁছে যায় ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকায়।
আর ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট সাড়ে ৯ লাখ কোটি টাকার মাইলফলকের কাছাকাছি পৌঁছেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির পরিমাণ, সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়ন পরিকল্পনার ব্যাপক বিস্তারের প্রতিফলন।
তবে বাজেটের আকার বৃদ্ধিই একমাত্র সাফল্যের সূচক নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই অর্থ কোথা থেকে আসে এবং কীভাবে ব্যয় করা হয়। স্বাধীনতার পর প্রথম বাজেটে যেখানে বৈদেশিক সহায়তা ছিল প্রধান ভরসা, সেখানে বর্তমানে জাতীয় বাজেটের বড় অংশই আসে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে। কর, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), শুল্ক এবং অন্যান্য রাজস্ব আয় এখন সরকারের অর্থের প্রধান ভিত্তি।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের ভাষ্য, বাজেটের এই দীর্ঘ যাত্রা বাংলাদেশের অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনেরও প্রমাণ। একসময় যে দেশ আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল, সেই দেশ এখন নিজস্ব রাজস্ব দিয়ে উন্নয়ন ব্যয়ের বড় অংশ বহন করতে সক্ষম। যদিও এখনও রাজস্ব ঘাটতি, ঋণ ব্যবস্থাপনা, মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের মতো চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে, তবুও বাজেটের আকারে এই বিস্ময়কর উত্থান দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার একটি শক্তিশালী বার্তা বহন করে।
৭৮৬ কোটি টাকার ছোট্ট সূচনা থেকে সাড়ে ৯ লাখ কোটি টাকার দোরগোড়ায় পৌঁছানো বাংলাদেশের বাজেট আসলে একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক বিবর্তনের ইতিহাস। এই ইতিহাসে রয়েছে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাস্তবতা, সংগ্রাম, পুনর্গঠন, উন্নয়ন এবং আত্মনির্ভরতার দীর্ঘ পথচলার প্রতিফলন।

