দেশে সড়ক দুর্ঘটনা যেন থামছেই না। গত মে মাসে দেশের বিভিন্ন সড়কে ঘটে যাওয়া ৬১৩টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৬২২ জন। আহত হয়েছেন আরও ১ হাজার ৬৫২ জন। একই সময়ে রেল ও নৌপথের দুর্ঘটনা যোগ করলে মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৭১ জনে। পরিবহন নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগের মধ্যেই নতুন এ পরিসংখ্যান দেশের সড়ক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং নিরাপত্তা সংকটকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রকাশিত মাসিক দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত দুর্ঘটনার খবর বিশ্লেষণ করে সংগঠনটির মনিটরিং সেল প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। তবে সংগঠনটির দাবি, দেশের অনেক দুর্ঘটনার খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয় না। ফলে প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা প্রকাশিত পরিসংখ্যানের চেয়েও বেশি হতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মে মাসে সড়ক, রেল ও নৌপথ মিলিয়ে মোট ৬৭৬টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৬৭১ জন এবং আহত হয়েছেন ১ হাজার ৬৯৬ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে সড়কপথে। দেশের সামগ্রিক পরিবহন ব্যবস্থায় সড়কনির্ভরতা যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও।
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা এখনও বড় উদ্বেগের কারণ হিসেবে রয়ে গেছে। গত মাসে ২২১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২৩১ জন নিহত এবং ২১৯ জন আহত হয়েছেন। অর্থাৎ মোট সড়ক দুর্ঘটনার একটি বড় অংশই মোটরসাইকেলকেন্দ্রিক। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত গতি, নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহারে অনীহা, অদক্ষ চালনা এবং ট্রাফিক আইন অমান্যের কারণে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে। সেখানে ১৮০টি দুর্ঘটনায় ১৮৫ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ৫৫৮ জন। রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় যানবাহনের ঘনত্ব, অতিরিক্ত চাপ এবং সড়কে শৃঙ্খলার অভাবকে এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে সবচেয়ে কম দুর্ঘটনা ঘটেছে ময়মনসিংহ বিভাগে। সেখানে ২৭টি দুর্ঘটনায় ৩৮ জন নিহত এবং ৬৭ জন আহত হয়েছেন। যদিও দুর্ঘটনার সংখ্যা তুলনামূলক কম, তবে প্রাণহানির হার এখনও উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।
প্রতিবেদনে হতাহতদের পেশা ও পরিচয় বিশ্লেষণ করেও উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে। নিহত ও আহতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ চালক, পথচারী, পরিবহন শ্রমিক, শিক্ষার্থী, নারী ও শিশু। অর্থাৎ দুর্ঘটনার শিকার শুধু যানবাহনের যাত্রী নয়, সড়ক ব্যবহারকারী প্রায় সব শ্রেণির মানুষ।
নিহতদের মধ্যে ১৩৬ জন চালক, ১১০ জন পথচারী, ৭৩ জন শিক্ষার্থী, ৬৯ জন নারী এবং ৫৯ জন শিশু রয়েছেন। এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত করে যে সড়ক নিরাপত্তা সংকট এখন সামাজিক ও মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে।
দুর্ঘটনায় জড়িত যানবাহনের তালিকায় মোটরসাইকেল সবচেয়ে এগিয়ে। এর পর রয়েছে ট্রাক, পিকআপ, কাভার্ডভ্যান, লরি, বাস, ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইক এবং সিএনজিচালিত অটোরিকশা। অর্থাৎ ভারী যানবাহন থেকে শুরু করে ছোট পরিবহন—সব ধরনের যানই দুর্ঘটনার সঙ্গে জড়িত।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণে দুর্ঘটনা বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। জাতীয় মহাসড়কে অনিয়ন্ত্রিতভাবে মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত যান ও অটোরিকশার চলাচল অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত সড়কবাতি, রোড সাইন এবং রোড মার্কিং না থাকাও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
এ ছাড়া অনেক স্থানে মহাসড়কের সঙ্গে সংযুক্ত ফিডার সড়কগুলো নিরাপত্তা মানদণ্ড ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। ফলে হঠাৎ করে ছোট যানবাহন দ্রুতগতির মহাসড়কে উঠে আসছে এবং সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। মিডিয়ান না থাকা, অন্ধবাঁক, সড়কের পাশে গাছপালা এবং অবকাঠামোগত ত্রুটিও দুর্ঘটনার বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
সংগঠনটির মতে, যান্ত্রিক ত্রুটিযুক্ত যানবাহন, অদক্ষ চালক, ফিটনেসবিহীন পরিবহন, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, বেপরোয়া গতি এবং বিশ্রাম ছাড়া দীর্ঘসময় গাড়ি চালানোর প্রবণতা দুর্ঘটনা বাড়িয়ে তুলছে। একই সঙ্গে উল্টো পথে চলাচল, ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন এবং সড়কে চাঁদাবাজির মতো সমস্যাও পরিবহন ব্যবস্থাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
বর্ষা মৌসুমে সড়কে গর্ত সৃষ্টি এবং ভাঙাচোরা অবকাঠামো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অনেক ক্ষেত্রে নিম্নআয়ের যাত্রীরা অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে ঝুঁকি নিয়ে বাস বা পণ্যবাহী যানবাহনের ছাদে যাতায়াত করছেন, যা প্রাণহানির আশঙ্কা বাড়াচ্ছে।
সড়ক নিরাপত্তা উন্নয়নে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। সংগঠনটির মতে, উন্নত দেশের আদলে আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা চালু করা এবং চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি।
তারা আরও বলেছে, গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে সার্ভিস লেন, নিরাপদ ফুটপাত, পথচারী পারাপারের আধুনিক ব্যবস্থা এবং নিয়মিত সড়ক নিরাপত্তা নিরীক্ষা চালু করতে হবে। পাশাপাশি ফিটনেস সনদ প্রদানের প্রক্রিয়া আধুনিকায়ন, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন অপসারণ, বিআরটিএর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ট্রাফিক প্রশিক্ষণ একাডেমি প্রতিষ্ঠার মতো উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
পরিবহন খাতে জবাবদিহি বাড়ানোর ওপরও জোর দিয়েছে সংগঠনটি। তাদের মতে, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; কার্যকর বাস্তবায়ন, কঠোর নজরদারি এবং পরিবহন ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কারও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে, সড়ক দুর্ঘটনা এখন কেবল পরিবহন সমস্যা নয়; এটি জননিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে প্রাণহানির এই মিছিল থামানো কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

