বাংলাদেশের গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় এমন কিছু মানুষ আছেন, যাদের অবদান পরিসংখ্যানের গণ্ডি ছাড়িয়ে মানবিকতার অনন্য উদাহরণ হয়ে ওঠে। মানিকগঞ্জের হুমাইয়ারা নিলুফা বেগম তেমনই একজন। প্রায় চার দশকের কর্মজীবনে তিনি নরমাল ডেলিভারির মাধ্যমে প্রায় ১০ হাজার নবজাতকের জন্মে সহায়তা করেছেন, যা শুধু একটি সংখ্যা নয়; বরং হাজারো পরিবারের আস্থা, স্বস্তি এবং নিরাপদ মাতৃত্বের গল্প।
বর্তমান সময়ে প্রসবকালীন চিকিৎসায় সিজারিয়ান অপারেশনের হার নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই ব্যতিক্রমী উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে নিলুফা বেগমের নাম। দীর্ঘ ৩৬ বছর ধরে তিনি স্বাভাবিক প্রসবকে উৎসাহিত করে আসছেন এবং দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অসংখ্য মাকে নিরাপদ মাতৃত্বের সেবা দিয়েছেন।
স্বাস্থ্যসেবা খাতে তার পথচলা শুরু হয় ১৯৯০ সালের জানুয়ারিতে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অধীনে পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা হিসেবে মানিকগঞ্জের বিভিন্ন ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। কর্মজীবনের বড় একটি সময় তিনি প্রত্যন্ত এলাকার মা ও শিশুস্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। এ সময় হাজারো গর্ভবতী নারীকে পরামর্শ, সেবা ও প্রসবকালীন সহায়তা প্রদান করেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একজন স্বাস্থ্যকর্মীর চেয়েও বেশি কিছু হয়ে উঠেছিলেন নিলুফা বেগম। অনেক পরিবারের কাছে তিনি ছিলেন নির্ভরতার প্রতীক। প্রসবের সময় আতঙ্কগ্রস্ত মায়েদের সাহস দেওয়া থেকে শুরু করে জটিলতা এড়াতে প্রয়োজনীয় পরামর্শ—সব ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন আন্তরিক ও দায়িত্বশীল।
সরকারি চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার পরও থেমে থাকেননি তিনি। বরং মানুষের সেবাকে আরও বিস্তৃত করতে নিজ এলাকায় একটি ছোট হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। স্বামীর স্বপ্ন বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে গড়ে ওঠা এই স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে বর্তমানে স্বল্প খরচে প্রসূতি সেবা দেওয়া হচ্ছে। এখানেও নরমাল ডেলিভারিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
নিলুফা বেগম মিডওয়াইফারি ও মাসিক নিয়মিতকরণ বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার কারণে আশপাশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকেও রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসেন। প্রতি মাসে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক স্বাভাবিক প্রসব সম্পন্ন হয় তার তত্ত্বাবধানে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো রোগীদের প্রতি আন্তরিকতা এবং আত্মবিশ্বাস জোগানোর ক্ষমতা। অনেক পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম তার সেবা গ্রহণ করছে। একসময় যাদের জন্মে তিনি সহায়তা করেছিলেন, এখন তাদের সন্তানদের জন্মের সময়ও তার শরণাপন্ন হচ্ছেন অনেকে।
নিলুফা বেগমের পরিবারের সদস্যরাও তার এই মানবিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। তার ছেলে চিকিৎসক হিসেবে হাসপাতাল পরিচালনায় সহযোগিতা করছেন। তাদের লক্ষ্য হলো গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং মা ও শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি কমিয়ে আনা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকিৎসাগত প্রয়োজন ছাড়া অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান অপারেশন কমাতে হলে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত মিডওয়াইফ এবং প্রসূতি সেবাকর্মীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিলুফা বেগমের মতো অভিজ্ঞ স্বাস্থ্যকর্মীরা এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক উদাহরণ তৈরি করেছেন।
নিলুফা বেগমের ভাষায়, একজন সুস্থ মা এবং নিরাপদ নবজাতকই তার কাজের সবচেয়ে বড় অর্জন। জীবনের দীর্ঘ সময়জুড়ে তিনি সেই লক্ষ্য নিয়েই কাজ করে গেছেন। তার বিশ্বাস, সচেতনতা বৃদ্ধি, সঠিক পরামর্শ এবং দক্ষ সেবার মাধ্যমে এখনও অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিরাপদ নরমাল ডেলিভারি সম্ভব।
মানিকগঞ্জের এই নারী স্বাস্থ্যসেবাকর্মীর গল্প প্রমাণ করে, নিষ্ঠা, অভিজ্ঞতা ও মানবিকতার সমন্বয় ঘটলে একজন মানুষ হাজারো জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে যেতে পারেন। প্রায় ১০ হাজার শিশুর পৃথিবীতে আগমনের সাক্ষী হয়ে নিলুফা বেগম আজ অনেক পরিবারের কাছে শুধু একজন স্বাস্থ্যকর্মী নন, বরং নিরাপদ মাতৃত্বের এক নির্ভরযোগ্য নাম।

