চট্টগ্রাম রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে (সিআরবি) জনবল কাগজে শতভাগ থাকলেও বাস্তবে মাঠে তার প্রতিফলন নেই বলে অভিযোগ উঠেছে। নিয়মিত পরিদর্শন ও তদারকির ঘাটতির কারণে রেলপথ অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। এতে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দায়িত্বে অবহেলা করেও একশ্রেণির কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়মিত সুবিধা পাচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, ‘মাসোহারা’ বা উৎকোচের মাধ্যমে অনেকেই শাস্তির আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। ফলে চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়েছে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে। সিআরবির বিভিন্ন নথি বিশ্লেষণ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কয়েকটি সিন্ডিকেট ও কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে পুরো ব্যবস্থায় অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরে চলমান।
সিআরবির অধীন উচ্চমান উপসহকারী প্রকৌশলী (এসএসএই-ওয়ে) এবং চট্টগ্রাম বন্দরসংলগ্ন সিজিপিওয়াই এলাকার রেলওয়ের প্রধান পণ্য পরিবহন ইয়ার্ডের অধীনে ১৪টি ওয়ার্কিং টিম বা গ্যাং কাগজে পূর্ণ জনবল নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। কোনো পদ শূন্য নেই বলে সূত্র জানিয়েছে। একইভাবে মিরসরাইয়ের চিনকি আস্তানা, ফেনী, লাকসাম ও কুমিল্লায়ও ১৪টি করে গ্যাং চালু রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি গ্যাংয়ে ৯ থেকে ১১ জন কর্মী থাকার কথা।
কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। অধিকাংশ ওয়েম্যান নিয়মিত লাইনে কাজ করছেন না। তাদের বড় অংশকে বিভিন্ন দপ্তরে সংযুক্ত থাকতে দেখা গেছে। এর মধ্যে রয়েছে সহকারী প্রকৌশলী, বিভাগীয় প্রকৌশলী এবং বিভাগীয় ব্যবস্থাপকের কার্যালয়সহ বিভিন্ন প্রশাসনিক অফিস।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রকৌশলী-১ এর অধীন গ্যাং নম্বর ১৪-তে মাত্র ৩ থেকে ৪ জন কর্মী মাঠে কাজ করছেন। বাংলাবাজার এলাকার এসআরভি রেলস্টেশনে যেখানে ৯ জন থাকার কথা, সেখানে কাজ করছেন মাত্র ১ জন ওয়েম্যান। অন্য গ্যাংগুলোতেও ১১ জনের জায়গায় ২ থেকে ৩ জনকে দেখা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, বিষয়টি জানার পরও পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেননি। এ নিয়ে রেলওয়ে মহাপরিচালকের দপ্তরেও অভিযোগ জমা পড়েছে।
চিনকি আস্তানার ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী, ফেনীর সহকারী প্রকৌশলীসহ একাধিক দপ্তরের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ রয়েছে। একই চিত্র দেখা গেছে এসএসএই (ওয়ে) চট্টগ্রাম ও ষোলশহরসহ বিভিন্ন ইউনিটে। ২০২৪ সালে রেলওয়ে মহাপরিচালকের দপ্তর থেকে ওয়েম্যানদের নিজ নিজ কর্মস্থলে ফেরার নির্দেশ দেওয়া হলেও তা পুরোপুরি মানা হয়নি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ফলে যারা নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে। এতে রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। ওয়েম্যানদের অনুপস্থিতিতে লাইনের নাট-বল্টু ঢিলা হওয়া বা ফাটল শনাক্ত না হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এতে লাইনচ্যুতি ও বড় দুর্ঘটনার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, এসএসএই (ওয়ে), সিজিপিওয়াই এবং গ্যাং মেইটদের মধ্যে যোগসাজশের মাধ্যমে অনেক ওয়েম্যান নিয়মিত উপস্থিত না থেকেও দায়িত্বে বহাল থাকছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, শাস্তি এড়াতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়মিত ‘মাসোহারা’ দেওয়া হয়। এতে গ্যাং মেইটদের ওপরও চাপ তৈরি করা হয়। চট্টগ্রামের একাধিক গ্যাংয়ের কর্মীদের মধ্যে এ ব্যবস্থা নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। তাদের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী চক্র পুরো ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করছে।
রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম বিভাগে অনেক ওয়েম্যান কর্মস্থলে না গিয়েও নিয়মিত বেতন-ভাতা তুলছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অনেকেই রাজনৈতিক প্রভাব বা বিভিন্ন দপ্তরে অবস্থান করে মাস শেষে বেতন নিচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, তারা মাঝে মাঝে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে কাগজে উপস্থিতি নিশ্চিত করেন।
একজন রেল কর্মচারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ব্যক্তিগত সুবিধার কারণে পুরো রেল ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কিন্তু দেখার কেউ নেই। কর্মচারীদের দাবি, রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কিছু কর্মী পক্ষ বদল করেও একই সুবিধা নিচ্ছেন। এতে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মের ধারাবাহিকতা চলছে।
রেলওয়ের নিয়ম অনুযায়ী প্রধান প্রকৌশলীর ছয় মাস পর পর ট্রলিতে করে লাইন পরিদর্শনের কথা রয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের কর্মীরা বলছেন, পরিদর্শনের আগেই তথ্য ফাঁস হয়ে যায়। ফলে পরিদর্শনের দিনে সবাই উপস্থিত হয়ে কাজের ভান করেন। পরিদর্শন শেষ হলেই পরিস্থিতি আগের মতো হয়ে যায়। তাদের মতে, শুধু ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের সচেতনতা দিয়ে নয়, মাঠপর্যায়ের তদারকি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী না করলে এই অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব নয়।
পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান প্রকৌশলী তানভীরুল ইসলাম জানান, এসব বিষয়ে একসঙ্গে ফোনে বিস্তারিত মন্তব্য দেওয়া কঠিন। তিনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের পরামর্শ দেন। তিনি আরও বলেন, জনবল ব্যবস্থাপনার পুরো কাঠামো চট্টগ্রাম পর্যায়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক ইউনিট থেকে পরিচালিত হয়।
অন্যদিকে রেল ভবনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভিযোগগুলো গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হবে। তবে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলীয় মহাব্যবস্থাপক মো. সুবক্তগীনও এ বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া দেননি।

