দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের জনবল সংকট তৈরি হয়েছে। আইনি জটিলতা, বিচারাধীন মামলা এবং প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতার কারণে প্রায় ৮৭ হাজার শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকের পদে নিয়োগ ও পদোন্নতি কার্যক্রম স্থবির হয়ে আছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী।
রোববার রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের শিক্ষা খাত বিশ্লেষণ’ শীর্ষক কর্মশালায় তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা মামলা এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতার কারণে শিক্ষা খাতের গুরুত্বপূর্ণ অনেক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। এর ফলে বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠছে।
শিক্ষামন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে। একই সঙ্গে নিয়োগ ও পদোন্নতি-সংক্রান্ত জটিলতায় আরও প্রায় ৪৭ হাজার শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকের পদে নিয়োগ আটকে আছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৮৭ হাজার পদে নিয়োগ কার্যক্রম বন্ধ থাকায় শিক্ষা ব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
তিনি জানান, প্রধান শিক্ষক নিয়োগের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে আদালতের নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। প্রায় ৩২ হাজার ৫০০ প্রধান শিক্ষক নিয়োগ তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে। এছাড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট প্রায় ৮৩ হাজার মামলা বর্তমানে বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলার কারণে নীতিগত ও প্রশাসনিক বহু সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শিক্ষক সংকট কেবল প্রশাসনিক সমস্যা নয়, এটি সরাসরি শিক্ষার মানের সঙ্গে সম্পর্কিত। পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকলে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ব্যাহত হয়, শিক্ষার্থীদের শেখার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সামগ্রিকভাবে শিক্ষার গুণগত মান কমে যায়।
তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পরিচালিত শিক্ষক নিয়োগ কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তার দাবি, প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া খুব দ্রুত সম্পন্ন করা হয়েছিল, যা নিয়ে নানা মহলে গুণগত মানের প্রশ্ন উঠেছে। এ কারণে নবনিযুক্ত শিক্ষকদের মূল্যায়নের পাশাপাশি প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হচ্ছে এবং তাদের প্রাথমিকভাবে দুই বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য আনন্দমুখর ও অংশগ্রহণমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করতে পাঠ্যক্রমে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমকে আরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মানসিক, শারীরিক ও সামাজিক বিকাশে সহায়তা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থী ঝরে পড়া কমাতে সরকার একাধিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে বলেও জানান তিনি। এর মধ্যে রয়েছে স্কুল ইউনিফর্ম বিতরণ, মধ্যাহ্নভোজ কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্যানিটেশন সুবিধা উন্নয়ন। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকার শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, বর্তমান সরকার শিক্ষা খাতে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি বরাদ্দের প্রস্তাব করেছে। তবে বাজেট বৃদ্ধি পেলেও শিক্ষার্থীদের শেখার ফলাফল এখনও প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। তাই অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকা শিক্ষক পদগুলো দ্রুত পূরণ না হলে শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে। তারা বিচারাধীন মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
বর্তমানে শিক্ষা খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই বিপুল সংখ্যক শূন্য পদ। সংশ্লিষ্টদের মতে, আইনি জটিলতা কাটিয়ে দ্রুত নিয়োগ কার্যক্রম চালু করা গেলে শিক্ষক সংকট অনেকটাই কমবে এবং দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার মান উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

