বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার তিন মাস পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। প্রতিদিনই নতুন আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় উদ্বেগ বাড়ছে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, হাম এবং হামসদৃশ উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা ইতোমধ্যে ৮৫ হাজার অতিক্রম করেছে। এ পর্যন্ত অন্তত ৬৫২ শিশুর মৃত্যুর তথ্যও নথিভুক্ত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের অন্যতম সংক্রামক রোগ হিসেবে পরিচিত হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়লেও শুরুতে প্রয়োজনীয় মাত্রার জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণে বিলম্ব হয়েছে। ফলে সংক্রমণ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তার লাভের সুযোগ পেয়েছে। তাদের মতে, রোগটির ব্যাপক বিস্তারের পরও জাতীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা না করা এবং সমন্বিত প্রতিরোধ কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়ন না হওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের ভাষ্য, হামের মতো সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে প্রথম কয়েক সপ্তাহই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আক্রান্ত এলাকা চিহ্নিত করে দ্রুত টিকাদান, মাঠপর্যায়ে নজরদারি বৃদ্ধি, চিকিৎসা সুবিধা সম্প্রসারণ এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা গেলে মৃত্যুহার অনেকাংশে কমানো সম্ভব হতো। কিন্তু বাস্তবে বিভিন্ন এলাকায় চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি, স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট এবং তথ্য আদান-প্রদানে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ উঠেছে।
রাজধানীসহ বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডগুলো এখনও রোগীতে পরিপূর্ণ। চিকিৎসকদের মতে, অধিকাংশ আক্রান্ত শিশু পাঁচ বছরের নিচে। অনেক ক্ষেত্রে অপুষ্টি, ভিটামিনের ঘাটতি এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য জটিলতার কারণে রোগটি মারাত্মক আকার ধারণ করছে। ফলে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের একটি অংশের অবস্থা দ্রুত সংকটাপন্ন হয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হামে মৃত্যুর বড় কারণ শুধু ভাইরাস নয়; বরং রোগ-পরবর্তী জটিলতা। নিউমোনিয়া, তীব্র ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্ট এবং অপুষ্টিজনিত সমস্যার কারণে শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে থাকে। তাই আক্রান্তের সংখ্যা কমানোর পাশাপাশি জটিলতা মোকাবিলায় চিকিৎসা ব্যবস্থাকেও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে অব্যবস্থাপনার অভিযোগ নাকচ করা হয়েছে। স্বাস্থ্য প্রশাসনের দাবি, নতুন দায়িত্ব গ্রহণের অল্প সময়ের মধ্যেই সংক্রমণের ঢেউ শুরু হয়েছিল। সে অবস্থায় দ্রুত টিকাদান কর্মসূচি, চিকিৎসা সহায়তা এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেনি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে মৃত্যুর সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে যেতে পারত।
তবে স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকদের প্রশ্ন, আক্রান্তের সংখ্যা যখন কয়েক মাস ধরে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছিল, তখন কেন আগেভাগে বৃহৎ পরিসরের প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তাদের মতে, শুধু চিকিৎসা নয়, সংক্রমণ প্রতিরোধে স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কমিউনিটি সংগঠন এবং স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন ছিল।
বিশ্বব্যাপী হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হিসেবে টিকাদানকে বিবেচনা করা হয়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশে নিয়মিত টিকাদানের আওতার বাইরে থাকা শিশুদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়াও বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ হতে পারে। অনেক এলাকায় সময়মতো টিকা না পাওয়া, অভিভাবকদের অনীহা এবং স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ হলো—দেশব্যাপী ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করা, টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা, আক্রান্ত এলাকার নিবিড় নজরদারি নিশ্চিত করা এবং হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জনবল বৃদ্ধি করা। একই সঙ্গে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
তিন মাস পরও হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসা দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সংক্রমণের গতি কমানো এবং আরও প্রাণহানি ঠেকানো। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত, সমন্বিত এবং বিজ্ঞানভিত্তিক পদক্ষেপ ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সহজ হবে না।

