দেশজুড়ে কৃষিপণ্যের অপচয় কমানো, কৃষকের আয় বৃদ্ধি এবং বাজার ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে বড় উদ্যোগের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দুই হাজার মিনি কোল্ড স্টোরেজ বা ক্ষুদ্র হিমাগার নির্মাণ করা হবে বলে জানিয়েছেন কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ।
একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, আগামী দেড় বছরের মধ্যেই পেঁয়াজ আমদানির প্রয়োজনীয়তা শেষ হবে এবং তিন বছরের মধ্যে পাটবীজ উৎপাদনে বাংলাদেশ শতভাগ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করবে।
সোমবার রাজধানীতে বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতায় আয়োজিত ‘স্মার্ট কৃষিতে সরকারি বিনিয়োগ’ বিষয়ক এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব তথ্য তুলে ধরেন। কৃষিমন্ত্রীর বক্তব্যে দেশের কৃষি খাতকে আরও আধুনিক, উৎপাদনশীল ও লাভজনক করে তোলার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার চিত্র উঠে আসে।
মন্ত্রী জানান, দেশের কৃষকরা বর্তমানে উৎপাদিত ফল, সবজি ও অন্যান্য পচনশীল কৃষিপণ্য সংরক্ষণের পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছেন। অনেক সময় বাজারে সরবরাহ বেশি থাকলে কৃষকদের কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হতে হয়। কিন্তু ক্ষুদ্র হিমাগার স্থাপন করা গেলে কৃষকরা উৎপাদিত পণ্য নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সংরক্ষণ করে বাজারের উপযুক্ত সময়ে বিক্রি করতে পারবেন। এতে একদিকে অপচয় কমবে, অন্যদিকে কৃষকের ন্যায্য মূল্য পাওয়ার সুযোগও বাড়বে।
তিনি বলেন, পরিকল্পিত এসব হিমাগার সমবায়ভিত্তিক ব্যবস্থায় পরিচালিত হবে। একটি হিমাগার ব্যবহার করে ১৫ থেকে ২০ জন কৃষক একসঙ্গে তাদের পণ্য সংরক্ষণ করতে পারবেন। এতে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরাও আধুনিক সংরক্ষণ সুবিধার আওতায় আসবেন।
কৃষিমন্ত্রী আরও বলেন, কৃষি খাতে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আনতে সরকার ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে। বিশেষ করে পেঁয়াজ উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। নতুন জাত উদ্ভাবন, চাষাবাদ সম্প্রসারণ এবং উৎপাদন ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে আগামী এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে দেশের চাহিদা দেশীয় উৎপাদনের মাধ্যমেই পূরণ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি জানান, পাট বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও দীর্ঘদিন ধরে পাটবীজের ক্ষেত্রে বিদেশি উৎসের ওপর নির্ভরতা ছিল। তবে গবেষণা কার্যক্রম ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে দেশীয়ভাবে মানসম্মত পাটবীজ উৎপাদনের সক্ষমতা দ্রুত বাড়ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী তিন বছরের মধ্যেই পাটবীজ আমদানির প্রয়োজন থাকবে না।
বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন কৃষিমন্ত্রী। তিনি বলেন, কৃষকরা প্রায়ই সঠিক বাজার তথ্যের অভাবে ক্ষতির মুখে পড়েন। কোন অঞ্চলে কোন পণ্যের চাহিদা বেশি, কোথায় মূল্য বেশি কিংবা কখন বাজারে সরবরাহ কম—এ ধরনের তথ্য সময়মতো না পাওয়ায় তারা উৎপাদনের যথাযথ মূল্য থেকে বঞ্চিত হন। তাই কৃষকদের কাছে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য বাজার তথ্য পৌঁছে দিতে সরকার নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করছে।
তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের অন্যতম ভিত্তি কৃষি। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা এই খাতের সঙ্গে জড়িত। ফলে কৃষিকে শক্তিশালী করা ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ কারণে চলতি অর্থবছরের বাজেটেও কৃষি খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কৃষি শুধু খাদ্য উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, দারিদ্র্য হ্রাস, পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, শিল্পের কাঁচামাল সরবরাহ, গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধিতে কৃষির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই কৃষির আধুনিকায়ন, প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, সংরক্ষণ সক্ষমতা সম্প্রসারণ এবং বাজার ব্যবস্থার উন্নয়নকে সরকারের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞরা বলেন, কৃষি খাতে সরকারি বিনিয়োগ আরও কার্যকরভাবে পরিচালিত হলে উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। বিশেষ করে গবেষণা, প্রযুক্তি সম্প্রসারণ, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে কৃষি খাত দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, দুই হাজার ক্ষুদ্র হিমাগার নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে কৃষিপণ্যের অপচয় কমবে, বাজারে মূল্য অস্থিতিশীলতা হ্রাস পাবে এবং কৃষকরা উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পাওয়ার সুযোগ পাবেন। একই সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং কৃষকের আয় বৃদ্ধিতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দেশের কৃষি খাতকে আরও প্রতিযোগিতামূলক ও টেকসই করে তুলতে এ উদ্যোগকে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

