প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে আবাসন খাতের ওপর নতুন কর আরোপের প্রস্তাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)। সংগঠনটির দাবি, ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে জমির মালিকদের প্রাপ্ত ফ্ল্যাটের ওপর ১৫ শতাংশ মূলধনি আয়কর আরোপ করা হলে আবাসন বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং ফ্ল্যাটের দাম আরও বেড়ে যাবে।
আজ (সোমবার) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব উদ্বেগের কথা তুলে ধরে রিহ্যাব। সংগঠনের পক্ষ থেকে নতুন এই কর প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন রিহ্যাব সভাপতি আলী আফজাল। তিনি বলেন, আবাসন খাত ইতোমধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে সরকারকে কর প্রদান করে আসছে। কিন্তু নতুন বাজেট প্রস্তাব পর্যালোচনা করলে মনে হচ্ছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই খাতকে রাজস্ব আদায়ের অন্যতম উৎস হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাই আবাসন খাতে নতুন করে আরোপিত কর ও শুল্ক পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে রিহ্যাবের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আবদুর রাজ্জাক, সহসভাপতি-২ আবু খালিদ মো. বরকত উল্লাহ, সহসভাপতি-৩ এ এফ এম ওবায়দুল্লাহ এবং সহসভাপতি (অর্থ) মো. হারুন অর রশিদসহ সংগঠনের অন্যান্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
রিহ্যাব সভাপতির ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানগুলো জমির মালিকদের সঙ্গে চুক্তি করার সময় যে অর্থ প্রদান করে, তার ওপর ১৫ শতাংশ কর পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থ প্রদানের পাশাপাশি জমির মালিকদের প্রাপ্ত ফ্ল্যাটের মূল্যমানের ওপরও ১৫ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে আলী আফজাল বলেন, কোনো প্রকল্পে ২৪টি ফ্ল্যাটের মধ্যে জমির মালিক যদি ১২টি ফ্ল্যাট পান এবং সেই ফ্ল্যাটগুলোর বাজারমূল্য ১২ কোটি টাকা হয়, তাহলে নতুন নিয়ম অনুযায়ী তাঁকে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা কর দিতে হবে। অর্থাৎ প্রায় দুটি ফ্ল্যাটের সমপরিমাণ অর্থ কর হিসেবে পরিশোধ করতে হবে।
তাঁর মতে, এই অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত জমির মালিকরা ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবেন। ফলে প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং তার প্রভাব গিয়ে পড়বে ফ্ল্যাটের ক্রেতাদের ওপর। তিনি সতর্ক করে বলেন, দ্রুত এই কর প্রত্যাহার না করা হলে আবাসন খাতের সংশ্লিষ্টদের আন্দোলনে যেতে হতে পারে। একই সঙ্গে রডসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রীর ওপর অতিরিক্ত কর আরোপেরও বিরোধিতা করেন তিনি।
তবে প্রস্তাবিত বাজেটে ভবন, ফ্ল্যাট ও জমি কেনার ক্ষেত্রে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে রিহ্যাব। সংগঠনটির মতে, এর মাধ্যমে অর্থনীতিতে নতুন অর্থের প্রবাহ তৈরি হবে এবং আবাসন খাতসহ বিভিন্ন খাত উপকৃত হবে।
রিহ্যাব আরও জানায়, বর্তমানে ফ্ল্যাট ও জমি নিবন্ধনের ব্যয় ১৩ শতাংশের বেশি হওয়ায় ক্রয়-বিক্রয়ের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। সংগঠনের দাবি, এশিয়ার বিভিন্ন দেশের তুলনায় বাংলাদেশে আবাসন খাতে নিবন্ধন ব্যয় অনেক বেশি। বাজেট-পূর্ব আলোচনায় এই ব্যয় ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দেওয়া হলেও বাজেটে তা প্রতিফলিত হয়নি।
আলী আফজাল বলেন, গত কয়েক বছরে প্রায় সব ধরনের নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়েছে। এর ফলে আগের তুলনায় ফ্ল্যাট নির্মাণ ব্যয় প্রায় ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি গৃহঋণের সুযোগ সীমিত থাকায় মধ্যবিত্তের বড় একটি অংশ আবাসন বাজার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, গত আড়াই বছরে তিন দফা সরকার পরিবর্তন এবং নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে আবাসন খাতে ক্রেতাদের মধ্যে এক ধরনের সতর্কতা ও অনাগ্রহ তৈরি হয়েছে, যা বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, প্রস্তাবিত বাজেটে পিভিসি রেজিন ও পেট রেজিনের ওপর কর দ্বিগুণ করা হয়েছে। পাশাপাশি কোল্ড-রোল্ড কয়েলের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক এবং কপার তার ও টিউবের কর ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্রতি টন রডের দাম তিন হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে বলেও দাবি করে সংগঠনটি। রিহ্যাবের মতে, নতুন কর ও শুল্কের কারণে আবাসন শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত প্রায় দুই কোটি মানুষে আয় ও জীবিকা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
সংগঠনটির দাবি, দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে আবাসন খাতের অবদান ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ এবং এ খাতে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। ফলে এই খাতের গতি কমে গেলে সরকারের প্রস্তাবিত সাড়ে ৬ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
এ অবস্থায় জাতীয় বাজেট চূড়ান্ত হওয়ার আগে আবাসন শিল্পে নতুন আরোপিত কর ও শুল্ক প্রত্যাহার এবং রিহ্যাবের উত্থাপিত প্রস্তাবগুলো পুনর্বিবেচনার জন্য প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

