জলবায়ু পরিবর্তন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বায়ুদূষণের প্রভাবে বাংলাদেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে বজ্রপাতের ঘটনা। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের আকাশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৭২ লাখ বজ্রপাত ও বজ্রঝলকের ঘটনা ঘটছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রাণহানি, বিশেষ করে কৃষক, জেলে ও খোলা আকাশের নিচে কাজ করা মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা।
চলতি বছরের প্রথম কয়েক মাসেই বজ্রপাতে বহু মানুষের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। বিভিন্ন জেলায় মাঠে কাজ করা কৃষক, নদীতে থাকা জেলে, স্কুলগামী শিক্ষার্থী এবং গবাদিপশু বজ্রাঘাতের শিকার হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এক দশক আগে বজ্রপাতকে আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করলেও প্রাণহানি কমাতে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ এখনও পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত সময় দেশে বজ্রপাতের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। এ সময় কালবৈশাখী ও মৌসুমি ঝড়ের সঙ্গে বজ্রমেঘ সৃষ্টি হয় এবং সেখান থেকেই তীব্র বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে। অনেক ক্ষেত্রে বজ্রপাতের একটি ধাপ ৪০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে, যা খোলা স্থানে অবস্থানকারীদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে।
পরিবেশ ও জলবায়ু গবেষকদের মতে, বজ্রপাত মূলত বায়ুমণ্ডলে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক চার্জের বিনিময়ের ফল। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ বাড়া এবং পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় বজ্রমেঘ তৈরির প্রবণতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। ফলে বজ্রপাতের সংখ্যাও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
গবেষণা তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের আকাশসীমায় বছরে গড়ে প্রায় ৭২ লাখ বজ্রপাত বা বজ্রঝলক শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে মেঘ থেকে মেঘে এবং মেঘ থেকে ভূমিতে আঘাত হানা উভয় ধরনের বজ্রপাত রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিসংখ্যান শুধু উদ্বেগজনকই নয়, বরং দেশের জন্য একটি বড় পরিবেশগত সতর্কবার্তা।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, বায়ুদূষণ বর্তমানে বজ্রপাত বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করছে। ইটভাটা, যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্পকারখানার নির্গমন এবং বিভিন্ন উৎস থেকে সৃষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডলে জমা হয়ে তাপমাত্রা বাড়াচ্ছে। এর সঙ্গে জলীয় বাষ্প যুক্ত হয়ে উচ্চমাত্রার চার্জ সৃষ্টি করছে, যা বজ্রমেঘ গঠনে সহায়তা করছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বঙ্গোপসাগর ও উত্তর ভারত মহাসাগর থেকে আসা অতিরিক্ত আর্দ্রতা। উষ্ণ বায়ু এবং আর্দ্রতার মিশ্রণে শক্তিশালী বজ্রমেঘ তৈরি হচ্ছে। এসব মেঘে সঞ্চিত বিপুল বৈদ্যুতিক শক্তি পরে বজ্রপাতের মাধ্যমে নির্গত হয়। এর সরাসরি শিকার হন মাঠে কাজ করা কৃষক, জেলে, দিনমজুর ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠী।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বজ্রপাত থেকে শতভাগ সুরক্ষা সম্ভব না হলেও সচেতনতা ও পূর্বপ্রস্তুতির মাধ্যমে প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। আকাশে কালো মেঘ জমা হওয়া, হঠাৎ তাপমাত্রা পরিবর্তন কিংবা বজ্রধ্বনি শোনা গেলে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে হবে। বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠ, নদী, জলাশয়, উঁচু গাছ, বৈদ্যুতিক খুঁটি কিংবা ধাতব বস্তুর কাছাকাছি থাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে পাকা ভবন, কংক্রিটের স্থাপনা কিংবা বিদ্যুৎ নিরোধক সুবিধাসম্পন্ন ঘরকে সবচেয়ে উপযোগী মনে করা হয়। বজ্রপাতের সময় ঘরের ভেতর থাকলেও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, তারযুক্ত টেলিফোন এবং ধাতব পাইপ থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষক ও জেলেদের জন্য আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা জোরদার করা এখন সময়ের দাবি। মোবাইল ফোনে স্বয়ংক্রিয় বার্তা, কমিউনিটি রেডিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে দ্রুত সতর্কতা পৌঁছে দেওয়া গেলে অনেক প্রাণ রক্ষা সম্ভব হবে।
এছাড়া মাঠাঞ্চলে নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর বজ্র আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। কোন ধরনের মেঘ বজ্রপাতের ঝুঁকি তৈরি করে, কতক্ষণ ঝুঁকি থাকতে পারে এবং বিপদের সময় কোথায় আশ্রয় নিতে হবে—এসব বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা কার্যক্রম প্রয়োজন বলে মনে করছেন গবেষকরা।
দীর্ঘমেয়াদে বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে পরিবেশ সুরক্ষার বিকল্প নেই বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। নির্বিচারে গাছ কাটা বন্ধ করা, জলাশয় সংরক্ষণ, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানো এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা ছাড়া বজ্রপাতের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, বজ্রপাত এখন শুধু একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত অবক্ষয়ের একটি স্পষ্ট সতর্কসংকেত। তাই ব্যক্তি পর্যায়ের সতর্কতার পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণই পারে ভবিষ্যতে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে।

