দুবাইয়ে গ্রেপ্তার সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া ঘিরে এখন দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। তাকে কীভাবে দ্রুত বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা যায়, সেটিই এখন মূল আলোচনার বিষয়।
সরকার ইতোমধ্যে তার প্রত্যর্পণের জন্য প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুতের কাজ শুরু করেছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ প্রস্তাব চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া সহজ করতে প্রস্তাবে শুধু দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা পাসপোর্ট জালিয়াতি ও দুর্নীতির ছয়টি মামলার নথি যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সব নথি পাঠানোর পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে আমিরাতের আদালত। সরকারি সূত্রগুলো বলছে, নথিপত্রের জটিলতা যেন প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত না করে, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নথি প্রস্তুত হয়ে গেলে তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক অধিশাখায় পাঠানো হবে। এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তা যাচাই করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। সেখান থেকে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হবে।
আইনি যাচাই ও আমিরাতের ভূমিকা:
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাওয়ার পর আমিরাতের কর্তৃপক্ষ প্রথমে সব নথি যাচাই করবে। এরপর তারা দেখবে অভিযোগগুলো তাদের দেশের আইনে অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় কি না। এছাড়া, বাংলাদেশে বেনজীর আহমেদের ন্যায্য বিচার নিশ্চিত হবে কি না—এ বিষয়টিও বিবেচনায় নেবে আমিরাতের আদালত। এসব বিবেচনার পরই তাকে ফেরানোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, দুদক-এ বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলায় ইতোমধ্যে পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া বৈষম্যবিরোধী ১৭টি মামলা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ৩টি পরোয়ানাও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
তদন্তাধীন অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে গুম কমিশনের অভিযোগ, শাপলা চত্বরের ঘটনা এবং সারাদেশে কথিত বিচারবহির্ভূত হত্যার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ। তবে প্রত্যর্পণ প্রস্তাবে আপাতত শুধু দুদকের ছয়টি মামলার নথি অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।
জানা গেছে, মামলার পরোয়ানাগুলো আরবি ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। নথি প্রস্তুত হলে তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যাবে, এরপর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দুবাইয়ে পাঠানো হবে। সূত্র অনুযায়ী, বুধবার অথবা বৃহস্পতিবারের মধ্যেই প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠানো হতে পারে। একজন পুলিশ কর্মকর্তার মতে, রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল অন্যান্য মামলার নথি আপাতত যুক্ত করা হচ্ছে না, যাতে প্রক্রিয়ায় কোনো আইনি জটিলতা তৈরি না হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী জানিয়েছেন, আইন অনুযায়ী ত্রিশ দিনের মধ্যে প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে এবং সেটি দ্রুতই পাঠানো হবে। তিনি আরও জানান, বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ চুক্তি না থাকলেও পারস্পরিক আইনি সহায়তা ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অপরাধ ও অভিযান) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, বেনজীর আহমেদকে ফেরানোর বিষয়ে এখন পুলিশের সরাসরি কাজ সীমিত। জাতীয় কেন্দ্রীয় ব্যুরো থেকে রেড নোটিস জারি হওয়ার পর পুলিশের দায়িত্ব মূলত শেষ হয়।
দুদক সূত্র জানিয়েছে, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থপাচার এবং পাসপোর্ট জালিয়াতিসহ ছয়টি মামলার নথি চূড়ান্ত করা হচ্ছে। এগুলো দ্রুতই কূটনৈতিক মাধ্যমে পাঠানো হবে। দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) মো. আকতারুল ইসলাম জানান, প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং শিগগিরই আনুষ্ঠানিক অনুরোধ পাঠানো হবে।
চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে প্রায় ১০টি মামলার তদন্ত চলছে। তিনি বলেন, শাপলা চত্বরের ঘটনার পাশাপাশি গুমসহ একাধিক মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তার সম্পৃক্ততার বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্ত সম্পন্ন হলে তাকে আদালতে হাজির করা হবে এবং প্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদও করা হবে বলে জানান তিনি।
দুবাই থেকে বেনজীর আহমেদকে দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া এখন কূটনৈতিক ও আইনি ধাপের মধ্যে প্রবেশ করেছে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থা সমন্বিতভাবে নথি প্রস্তুত ও যাচাইয়ের কাজ করছে। এখন নজর আমিরাতের আদালতের সিদ্ধান্তের দিকে।

