বাংলাদেশি ব্যবসায়ী সাইফুল আলমের (এস আলম) আন্তর্জাতিক সম্পদ ঘিরে তদন্ত এখন আরও বিস্তৃত রূপ নিচ্ছে। বিভিন্ন দেশের অর্থপাচারবিরোধী সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একসঙ্গে তাঁর ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কের উৎস, বিনিয়োগ এবং মালিকানার কাঠামো খতিয়ে দেখছে। অভিযোগ রয়েছে, ব্যাংক ঋণ ও আর্থিক লেনদেনের জটিল কাঠামোর মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে সরানো হয়েছে এবং সেই অর্থ দিয়ে বহু দেশে সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি নজর পড়েছে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে অবস্থিত দুটি উচ্চমানের হোটেলের দিকে। আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডে পরিচালিত এই দুটি হোটেল—একটি রেনেসাঁ কুয়ালালামপুর এবং পাশের ফোর পয়েন্টস বাই শেরাটন—দীর্ঘদিন ধরে একটি মালিকানাধীন কোম্পানির অধীনে পরিচালিত হচ্ছে, যার সঙ্গে এস আলম গ্রুপের সংশ্লিষ্টতার দাবি তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এই হোটেলগুলোকে ঘিরে মালিকানা কাঠামো, শেয়ারহোল্ডিং ও অর্থায়নের উৎস এখন নিবিড়ভাবে যাচাই করা হচ্ছে।
তদন্ত সূত্রে জানা যায়, মালয়েশিয়াভিত্তিক একটি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান এই সম্পদের মূল মালিক হিসেবে তালিকাভুক্ত। এর পরের ধাপে মালিকানা সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি হোল্ডিং কাঠামোর মাধ্যমে আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক ফান্ড ও বিনিয়োগ সংস্থার কাছে পৌঁছায়। এসব স্তরবিন্যস্ত কাঠামোর কারণে প্রকৃত অর্থের উৎস ও নিয়ন্ত্রণকারী পক্ষ শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে তদন্তকারীরা মনে করছেন।
২০১৬ সালে মালয়েশিয়ার একটি বড় সম্পত্তি উন্নয়ন কোম্পানি এই হোটেল সম্পদ বিক্রি করে দেয় প্রায় ৭৬ কোটি রিঙ্গিতের বেশি দামে। পরবর্তীতে সংস্কার ও পুনর্গঠনের পর এটি আন্তর্জাতিক হোটেল ব্র্যান্ডের অধীনে পুনরায় চালু হয়। তবে সাম্প্রতিক তদন্তে এই সম্পদের প্রকৃত অর্থায়ন ও চূড়ান্ত মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের সম্পদ সাধারণত বিনিয়োগ হোল্ডিং, ফান্ড এবং সাবসিডিয়ারির মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যা অর্থের উৎস আড়াল করতে ব্যবহার করা হতে পারে। ফলে বিভিন্ন দেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এখন মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, সাইপ্রাসসহ একাধিক অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা আর্থিক নথি পর্যালোচনা করছে।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এস আলমের বিরুদ্ধে চলমান তদন্তে সাইপ্রাসের একটি আবাসিক সম্পত্তি জব্দের ঘটনা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আদালতের নির্দেশে ওই সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার পর বিষয়টি অর্থপাচার তদন্তকে আরও জোরদার করেছে। একই সময়ে বাংলাদেশের আদালত তাঁর বিরুদ্ধে ঋণখেলাপি সংক্রান্ত মামলায় কারাদণ্ড প্রদান করে, যা দেশীয় আইনি প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, বিভিন্ন দেশে তাঁর ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কের বিস্তার ব্যাংক ঋণ, অফশোর কোম্পানি এবং জটিল কর্পোরেট কাঠামোর মাধ্যমে তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়াই বিদেশে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগের অভিযোগও রয়েছে। এসব অর্থের একটি অংশ সিঙ্গাপুরে আবাসন, হোটেল ও বাণিজ্যিক সম্পত্তিতে ব্যবহৃত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সিঙ্গাপুরে তাঁর সম্পদের পরিমাণ শত কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সেখানে তাঁর প্রতিষ্ঠিত বা সংশ্লিষ্ট একাধিক কোম্পানি বর্তমানে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারিতে রয়েছে।
বাংলাদেশি তদন্ত সংস্থাগুলো দাবি করছে, দেশের বড় কয়েকটি ব্যাংক থেকে নেওয়া বিপুল ঋণ পরবর্তীতে বিদেশে পাচার হয়ে যেতে পারে এবং তা বিভিন্ন অফশোর কোম্পানির মাধ্যমে বিনিয়োগে রূপ নিয়েছে। এই অর্থ প্রবাহের নথি এখন একাধিক দেশের অর্থনৈতিক গোয়েন্দা সংস্থা একসঙ্গে বিশ্লেষণ করছে।
অন্যদিকে, মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশে শ্রমবাজার সংক্রান্ত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আলোচনাও এই প্রেক্ষাপটে নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। শ্রমিক নিয়োগ, মধ্যস্বত্বভোগী এজেন্ট এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ—সব মিলিয়ে এই খাতেও অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ও বিতর্ক রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিকভাবে সমন্বিত তদন্তের ফলে এখন আর কোনো একক দেশের মধ্যে এই আর্থিক নেটওয়ার্ক সীমাবদ্ধ নেই। সাইপ্রাস থেকে শুরু করে সিঙ্গাপুর এবং মালয়েশিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা সম্পদ ও বিনিয়োগ কাঠামো একে ধীরে ধীরে একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অপরাধ তদন্তের কেন্দ্রে পরিণত করছে।
যদিও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সব ধরনের অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং দাবি করেছেন তাঁর সব বিনিয়োগ বৈধ উৎস থেকে এসেছে, তবুও বিভিন্ন দেশের আদালত ও তদন্ত সংস্থার ধারাবাহিক পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে পর্যবেক্ষকদের মতে, এক সময় যিনি দেশের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তাঁর আন্তর্জাতিক সম্পদের বিস্তৃত জাল এখন বৈশ্বিক তদন্তের কঠোর নজরদারির মধ্যে রয়েছে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় আইনি ও কূটনৈতিক অগ্রগতির দিকে যেতে পারে।

