২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশের মূলধারার গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভুল তথ্য নিয়ে একটি বিস্তৃত বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার। তাদের পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এ সময়ে ১৭৭টি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত শত শত প্রতিবেদন যাচাই করে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে। প্রতিবেদনে ভুল তথ্য প্রকাশের হার, বিষয়ভিত্তিক প্রবণতা, রাজনৈতিক বয়ান এবং সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিভ্রান্তিকর ঘটনাগুলোর চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
সোমবার (২৭ জুলাই) প্রকাশিত এ বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে রিউমর স্ক্যানার জানায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ১৭৭টি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত মোট ৬৮১টি প্রতিবেদন যাচাইয়ের পর ভুল তথ্য প্রচারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। একই সময়ে ১৪৬টি পৃথক ঘটনায় বিভ্রান্তিকর বা অসত্য তথ্য প্রকাশিত হয়েছে বলে তাদের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ভুল তথ্যসম্বলিত প্রতিবেদনের সংখ্যার বিচারে তালিকার শীর্ষে রয়েছে দৈনিক ইনকিলাব। পত্রিকাটিতে ২১টি ভুল তথ্যসংবলিত প্রতিবেদন শনাক্ত হয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ইত্তেফাক, যেখানে ১৯টি ভুল তথ্য পাওয়া গেছে।
তৃতীয় স্থানে যৌথভাবে রয়েছে যুগান্তর ও বিডি২৪রিপোর্ট। এ দুটি সংবাদমাধ্যমে ১৪টি করে ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে। চতুর্থ স্থানে থাকা বাংলাদেশ টাইমসে ভুল তথ্যসংবলিত প্রতিবেদন পাওয়া গেছে ১৩টি। পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে কালবেলা, যেখানে এমন প্রতিবেদনের সংখ্যা ১২টি।
এছাড়া ১১টি ভুল তথ্য নিয়ে ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে রূপালী বাংলাদেশ। সপ্তম স্থানে যৌথভাবে রয়েছে বৈশাখী টিভি এবং বার্তা বাজার, যেখানে ১০টি করে ভুল তথ্যসংবলিত প্রতিবেদন শনাক্ত হয়েছে।
রিউমর স্ক্যানারের বিশ্লেষণে আরও উঠে এসেছে, ব্যক্তি পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ঘিরে। এসব তথ্যের প্রায় ৮৭ শতাংশই ইতিবাচক বয়ানের ছিল। অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য ছড়ানো হয়েছে বিএনপিকে নিয়ে, যার প্রায় ৫০ শতাংশ ইতিবাচক প্রকৃতির বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মাসভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মার্চ ও জুন মাসে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে। এ দুই মাসে ৩৪টি করে ঘটনার তথ্য যাচাইয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য পাওয়া গেছে, যা মোট ঘটনার প্রায় ২৩ শতাংশ করে। এপ্রিলে শনাক্ত হয়েছে ২৭টি ঘটনা বা প্রায় ১৮ শতাংশ। বিপরীতে জানুয়ারি মাসে সবচেয়ে কম, মাত্র ১৫টি ঘটনায় ভুল তথ্য পাওয়া গেছে।
বিষয়ভিত্তিক বিশ্লেষণে আন্তর্জাতিক ইস্যুকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এ ধরনের ভুল তথ্যসংবলিত প্রতিবেদন ছিল ৫৪টি। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রাজনৈতিক বিষয়, যেখানে ৪১টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে। জাতীয় বিষয়ক প্রতিবেদনে ভুল তথ্য পাওয়া গেছে ২৯টি।
এ ছাড়া খেলাধুলা বিষয়ক ১০টি, ধর্মীয়, বিনোদন এবং শিক্ষা–সংক্রান্ত ৩টি করে, স্বাস্থ্য বিষয়ে ২টি এবং পরিবেশ ও জলবায়ু–সংক্রান্ত ১টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বোঝা যায়, ভুল তথ্যের বিস্তার শুধু রাজনীতি বা চলমান ঘটনাতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং বিভিন্ন বিষয়েই বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকাশের প্রবণতা রয়েছে।
সবচেয়ে বেশি গণমাধ্যমে একই ভুল তথ্য প্রচারের ঘটনাও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে। রিউমর স্ক্যানারের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ জুন লক্ষ্মীপুরে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে অন্তত ৬৭টি মূলধারার সংবাদমাধ্যম ভুল তথ্য প্রকাশ করে। ওই ঘটনায় নিহত এক নারীকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে দাবি করা হলেও যাচাইয়ে দেখা যায়, তিনি আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের ২০২২–২০২৩ শিক্ষাবর্ষের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং এইচএসসি পাস করলেও কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হননি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি গণমাধ্যমে ভুল তথ্য প্রচারিত হয়েছে এমন শীর্ষ ছয় ঘটনার মধ্যে তিনটি ছিল জাতীয় ইস্যু। বাকি ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি রাজনৈতিক, একটি স্বাস্থ্য এবং একটি আন্তর্জাতিক বিষয়ক। এছাড়া অন্তত ১০টির বেশি সংবাদমাধ্যম একই ধরনের ভুল তথ্য প্রচার করেছে—এমন ঘটনার সংখ্যা ছিল ১৩টি।
রিউমর স্ক্যানার বলছে, দ্রুত সংবাদ প্রকাশের প্রতিযোগিতা, যাচাই ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য ব্যবহার এবং প্রাথমিক তথ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা অনেক ক্ষেত্রে ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হয়ে উঠছে। ফলে সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়া আরও শক্তিশালী করা এবং সম্পাদকীয় পর্যায়ে সতর্কতা বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

