দেশের নারী উদ্যোক্তা আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তা, সাবেক এম পি সেলিমা আহমাদ আর নেই। থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার সন্ধ্যায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পখাত এবং নারী উদ্যোক্তা সমাজে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
পারিবারিক ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বেশ কিছুদিন ধরে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন সেলিমা আহমাদ। রোববার বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটের দিকে তিনি মারা যান। তাঁর মরদেহ আগামী মঙ্গলবার দেশে আনা হবে বলে জানা গেছে।
সেলিমা আহমাদ ছিলেন দেশের অন্যতম শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিটল-নিলয় গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন। নারী উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, ব্যবসায়িক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নতুন প্রজন্মের নারী ব্যবসায়ীদের সামনে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা বলছেন, বাংলাদেশের নারী উদ্যোক্তা উন্নয়নের ইতিহাসে সেলিমা আহমাদের নাম একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে। এমন এক সময়ে তিনি নারী উদ্যোক্তাদের সংগঠিত করার কাজ শুরু করেছিলেন, যখন ব্যবসা-বাণিজ্যে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল তুলনামূলকভাবে সীমিত। তাঁর নেতৃত্বে অসংখ্য নারী ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
শুধু ব্যবসায়ী হিসেবেই নয়, নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নারী উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির নানা বিষয় তুলে ধরেছিলেন। ব্যবসা ও সমাজ উন্নয়নকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে তিনি সবসময় সোচ্চার ছিলেন।
সেলিমা আহমাদের কর্মজীবনের বড় একটি অংশ জুড়ে ছিল নারীদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলার প্রচেষ্টা। তিনি বিশ্বাস করতেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। এ কারণে প্রশিক্ষণ, নেটওয়ার্কিং, অর্থায়নের সুযোগ বৃদ্ধি এবং উদ্যোক্তা বিকাশের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন তিনি।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তাঁর অবদান স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০১৪ সালে তিনি ‘অসলো বিজনেস ফর পিস অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন। ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি সামাজিক দায়বদ্ধতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং শান্তিপূর্ণ উন্নয়নকে উৎসাহিত করার জন্য তাঁকে এ সম্মাননা দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই স্বীকৃতি বাংলাদেশের নারী উদ্যোক্তাদের জন্যও ছিল একটি গর্বের অর্জন।
দেশের ব্যবসায়ী মহলের মতে, সেলিমা আহমাদ এমন একজন নেতা ছিলেন, যিনি ব্যবসাকে শুধু মুনাফার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার একটি মাধ্যম হিসেবে দেখেছেন। তাঁর নেতৃত্ব, দূরদর্শিতা এবং নারী ক্ষমতায়নে অবদান দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
তাঁর মৃত্যুতে দেশের শিল্প ও বাণিজ্য খাত একজন অভিজ্ঞ সংগঠককে হারাল। একই সঙ্গে নারী উদ্যোক্তাদের একটি বড় অনুপ্রেরণার উৎসও নিভে গেল। তবে ব্যবসা, নেতৃত্ব এবং নারী উন্নয়নে তাঁর রেখে যাওয়া অবদান আগামী প্রজন্মের জন্য পথনির্দেশক হয়ে থাকবে।

