দেশে খুন, ধর্ষণ, গণপিটুনি, মব সহিংসতা, ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছু ক্ষেত্রে উন্নতির দাবি করা হলেও সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনও স্বস্তি ফিরে আসেনি।
মানবাধিকার সংগঠন, অপরাধ বিশ্লেষক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, বিচ্ছিন্ন নয়, বরং ধারাবাহিকভাবে ঘটে চলা সহিংস ঘটনাগুলো জনমনে গভীর অনিরাপত্তাবোধ সৃষ্টি করছে।
চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসের বিভিন্ন পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশে হত্যাকাণ্ড, নারী ও শিশু নির্যাতন, গণপিটুনি এবং রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা এখনও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে দেশে হত্যা মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৪৫২। একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় মামলা হয়েছে প্রায় আট হাজার। অপহরণ, অস্ত্র উদ্ধার, মাদক এবং চুরি-ছিনতাই-ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধের হাজার হাজার মামলাও এই সময়ে নথিভুক্ত হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পরিসংখ্যান আরও উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরছে। বিভিন্ন সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, বছরের প্রথম পাঁচ মাসে শতাধিক মানুষ মব সহিংসতা ও গণপিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছেন। একই সময়ে শত শত নারী ও শিশু ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন এবং সহিংসতার শিকার হয়েছেন। নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার এই ধারাবাহিকতা সমাজে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি আরও বাড়িয়ে তুলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি নতুন উদ্বেগের নাম হয়ে উঠেছে ‘মব জাস্টিস’ বা গণপিটুনি। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার পরিবর্তে জনতা নিজেরাই বিচারক ও শাস্তিদাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে। গুজব, সন্দেহ বা অভিযোগের ভিত্তিতে সংঘটিত এসব সহিংসতা শুধু আইনের শাসনের জন্য হুমকি নয়, বরং সভ্য সমাজের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ।
অপরাধ বিশ্লেষকদের ভাষ্য, কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে তার বিচার আদালতে হওয়ার কথা। কিন্তু বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থাহীনতা, সামাজিক উত্তেজনা এবং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার সংস্কৃতি অনেক ক্ষেত্রে মানুষকে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে উৎসাহিত করছে। এর ফলে নিরপরাধ মানুষও কখনও কখনও সহিংসতার শিকার হচ্ছেন।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছিনতাই, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা এবং প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দিনের আলোতেই সংঘবদ্ধ অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় আতঙ্ক আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
নাগরিকদের অভিযোগ, শুধু অপরাধের সংখ্যা নয়, অপরাধের ধরনও বদলে যাচ্ছে। আগের তুলনায় অনেক অপরাধ এখন আরও প্রকাশ্য, সহিংস এবং নির্মম রূপ নিচ্ছে। ফলে মানুষ নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনাও পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। বিভিন্ন অভিযানে পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা হামলার শিকার হয়েছেন। কোথাও অবরুদ্ধ করা হয়েছে, কোথাও হামলা বা প্রাণঘাতী আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মতে, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অনেক সময় তারা নানা ধরনের প্রতিরোধের সম্মুখীন হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি শুধু অভিযান বাড়ানোর মাধ্যমে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন অপরাধ দমনে কার্যকর তদন্ত, দ্রুত বিচার, সামাজিক সচেতনতা এবং আইনের প্রতি মানুষের আস্থা পুনর্গঠন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক সব পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন এবং গণপিটুনির মতো অপরাধের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত না হলে অপরাধীদের মধ্যে ভয় তৈরি হবে না। ফলে অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে। তারা মনে করেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙতে না পারলে দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতির উন্নতি কঠিন হবে।
অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীরাও মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেবল নিরাপত্তার বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, বিনিয়োগ, শিক্ষা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। যখন মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, তখন সামাজিক আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সামগ্রিক উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হয়।
অন্যদিকে পুলিশ বলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তারা কাজ করে যাচ্ছে এবং ধীরে ধীরে উন্নতিও হচ্ছে। তবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা, সংঘবদ্ধ অপরাধ এবং কিছু এলাকায় পুলিশের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার সংস্কৃতি এখনও বড় বাধা হয়ে রয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে দাবি তাদের।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে শুধু অপরাধ নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতা বৃদ্ধি এবং জনআস্থা পুনরুদ্ধারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। অন্যথায় খুন, ধর্ষণ ও মব সহিংসতার মতো অপরাধ সমাজে আরও গভীর ক্ষত তৈরি করবে এবং নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়বে।

