বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা এমনিতেই ঘনবসতি, অপরিকল্পিত নগরায়ন, পুরোনো ভবন, সরু রাস্তা ও ভরাট জলাশয়ের ওপর গড়ে ওঠা আবাসিক এলাকার কারণে বহুদিন ধরেই দুর্যোগঝুঁকির আলোচনায় আছে। এর মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কয়েক দফা ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে চিন্তার জায়গা হলো, এসব ভূমিকম্পের কয়েকটির উৎপত্তিস্থল ছিল রাজধানীর খুব কাছাকাছি।
সর্বশেষ ভূমিকম্পটি অনুভূত হয় ২২শে জুন সোমবার রাত আটটা ২৮ মিনিটে। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল চার দশমিক চার। উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার দূরে। শহরের এত কাছে ভূমিকম্পের উৎপত্তি হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, এটি কি কেবল স্বাভাবিক ভূত্বকীয় নড়াচড়ার ফল, নাকি ঢাকার জন্য কোনো বড় সতর্কবার্তা?
এর আগে চলতি বছরের পহেলা ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের কালিয়াকৈরে তিন দশমিক দুই মাত্রার একটি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়। ঢাকার কাছাকাছি উৎপত্তিস্থল বিবেচনায় ২২শে জুনের ঘটনার পর এটিও উল্লেখযোগ্য। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার নিকটবর্তী উৎপত্তিস্থল নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত ও শক্তিশালী ভূমিকম্পটি হয়েছিল ২০২৫ সালের নভেম্বরের শেষ দিকে, নরসিংদীতে। পাঁচ দশমিক সাত মাত্রার সেই ভূমিকম্পকে গত কয়েক দশকে দেশের ভেতরে উৎপত্তি হওয়া অন্যতম শক্তিশালী কম্পন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ওই ভূমিকম্পের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নরসিংদী ও ঢাকার আশপাশে আরও তিনটি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছিল। সংখ্যায় কম নয়, আবার স্থানগত দিক থেকেও ঘটনাগুলো উপেক্ষা করার মতো নয়। কারণ বারবার একই অঞ্চলে কম্পন হলে সেটি গবেষকদের কাছে নতুন অনুসন্ধানের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
২২শে জুনের ভূমিকম্প: উৎপত্তিস্থল নিয়ে ভিন্ন তথ্য
২২শে জুন রাত সাড়ে আটটার দিকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় যে ভূমিকম্প অনুভূত হয়, সেটি নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার তথ্যে কিছু পার্থক্য দেখা যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল চার দশমিক চার। উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদী থেকে ১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে। গভীরতা ছিল ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার নিচে।
ভারতের জাতীয় ভূকম্পন কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ওই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল চার। তাদের হিসাবে উৎপত্তিস্থল ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে ১৬ কিলোমিটার গভীরে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল চার। উৎপত্তিস্থল ছিল নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে, যা ঢাকা থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার পূর্বে। উৎপত্তিস্থল নিয়ে এই পার্থক্যের ব্যাখ্যায় ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবায়েত কবীর জানিয়েছেন, নরসিংদী থেকে ১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে গেলে সেটি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ এলাকার মধ্যেই পড়ে।
অর্থাৎ, বিভিন্ন সংস্থার ভাষ্য আলাদা হলেও মূল উদ্বেগ একই জায়গায় এসে মেলে—কম্পনের কেন্দ্র রাজধানীর খুব দূরে নয়।
গত বছরের পহেলা জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ২২শে জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ ও সীমান্তবর্তী এলাকায় যে ভূমিকম্পগুলো হয়েছে, তার মধ্যে বেশ কয়েকটির উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার আশপাশে। চলতি বছরের পহেলা ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের কালিয়াকৈরে তিন দশমিক দুই মাত্রার ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়, যার কেন্দ্র ঢাকা থেকে প্রায় ৪২ কিলোমিটার দূরে ছিল।
২০২৫ সালের ২১শে নভেম্বর: ঢাকার জন্য বড় ধাক্কা
২০২৫ সালের ২১শে নভেম্বর সকাল ১০টা ৩৮ মিনিট ২৬ সেকেন্ডে পাঁচ দশমিক সাত মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ওই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদী জেলা শহর থেকে প্রায় ১৪ কিলোমিটার পশ্চিম-দক্ষিণ-পশ্চিমে মাধবদী এলাকায়। গভীরতা ছিল ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার নিচে। ঢাকা থেকে উৎপত্তিস্থলের দূরত্ব ছিল মাত্র ১৩ কিলোমিটার।
এই ভূমিকম্প শুধু কম্পন হিসেবে নয়, ক্ষয়ক্ষতির কারণেও আলোচনায় আসে। ওই ঘটনায় ঢাকায় চারজন, নরসিংদীতে পাঁচজন এবং নারায়ণগঞ্জে একজন নিহত হন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সাড়ে চার শতাধিক মানুষ আহত হন। এর মধ্যে শুধু গাজীপুরেই আহত হন ২৫২ জন।
এখানেই ঘটনা শেষ হয়নি। মাধবদীর ভূমিকম্পের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আরও তিনবার কম্পন অনুভূত হয়। মোট চারটি ভূমিকম্পের মধ্যে তিনটির উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদী জেলার দুটি উপজেলা, আর একটির উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকার বাড্ডা এলাকায়।
২২শে নভেম্বর নরসিংদীর পলাশে তিন দশমিক তিন মাত্রার ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়। ঢাকা থেকে সেই কেন্দ্রের দূরত্ব ছিল ২৯ কিলোমিটার। একই দিনে ঢাকার বাড্ডায় তিন দশমিক সাত মাত্রার ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়। পরে নরসিংদীতে চার দশমিক তিন মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়, যার কেন্দ্র ঢাকা থেকে প্রায় ২৩ কিলোমিটার দূরে ছিল।
এর কয়েকদিন পর, ২৭শে নভেম্বর নরসিংদীর ঘোড়াশালে তিন দশমিক ছয় মাত্রার ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়। এর কেন্দ্র ছিল ঢাকা থেকে ২৮ কিলোমিটার দূরে। এরপর এক সপ্তাহের মাথায় চৌঠা ডিসেম্বর নরসিংদীর শিবপুরে চার দশমিক এক মাত্রার আরেকটি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়। ঢাকা থেকে এর কেন্দ্র ছিল ৩৮ কিলোমিটার দূরে।
এই ধারাবাহিকতা সাধারণ মানুষের মনে ভয় তৈরি করলেও বিশেষজ্ঞদের কাছে বিষয়টি আরও গভীর পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে। কারণ ভূমিকম্প শুধু একক ঘটনা নয়; এর ভৌগোলিক অবস্থান, গভীরতা, পুনরাবৃত্তি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট মিলিয়ে ঝুঁকি বোঝা যায়।
কেন একই অঞ্চলে বারবার কম্পন?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. বদরুদ্দোজা মিয়ার মতে, সাম্প্রতিক এসব ভূমিকম্প ভূত্বকীয় কার্যকলাপের কারণে হতে পারে। আবার কোনো সক্রিয় চ্যুতি রেখার সঙ্গেও এর সম্পর্ক থাকতে পারে। অনেক সময় নতুন চ্যুতি তৈরি হয়। আবার বহুদিন নিষ্ক্রিয় থাকা পুরোনো চ্যুতিও নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক অবস্থানও এই ঝুঁকির একটি বড় কারণ। দেশটি ইউরেশীয় ও ভারতীয় ভূত্বকীয় ফলকের সংযোগস্থলের মাঝামাঝি এলাকায় অবস্থিত। অন্যদিকে আছে বর্মী ফলক। এই তিন ফলকের পারস্পরিক চাপ ও নড়াচড়ার কারণে বাংলাদেশ ও আশপাশের অঞ্চলে ভূমিকম্প নতুন কিছু নয়।
তবে সব ভূমিকম্প একই অর্থ বহন করে না। ছোট বা মাঝারি মাত্রার কম্পন অনেক সময় বড় ভূমিকম্পের সরাসরি পূর্বাভাস নয়। আবার ধারাবাহিক কম্পন কোনো অঞ্চলের ভেতরের চাপ সরে যাওয়ার ইঙ্গিতও হতে পারে। তাই শুধু মাত্রা দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়; কোথায় হচ্ছে, কত গভীরে হচ্ছে, কত ঘন ঘন হচ্ছে—এসবও সমান জরুরি।
ছোট ভূমিকম্প কি বড় বিপদের পূর্বাভাস?
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পূরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও ভূমিকম্প গবেষক মেহেদি আহমেদ আনসারীর মতে, সম্প্রতি ঢাকার কাছাকাছি যেসব ছোট বা মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হচ্ছে, সেগুলো থেকে বড় ধরনের ভবনধস বা ব্যাপক প্রাণহানির আশঙ্কা নেই। তবে এগুলোকে অবহেলা করার সুযোগও নেই। বরং এগুলো মানুষকে ভূমিকম্প সম্পর্কে সচেতন হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।
তার মতে, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো ঐতিহাসিকভাবে সাত বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প ঘটাতে সক্ষম চ্যুতি অঞ্চলগুলো। ভবিষ্যতে বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি দেখা হয় বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চল এবং ঢাকার কাছাকাছি শ্রীমঙ্গল ও বগুড়ার শেরপুর এলাকায়। কারণ ইতিহাসে এসব অঞ্চলে সাতের বেশি মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পের রেকর্ড আছে।
১৯১৮ সালে সিলেটের শ্রীমঙ্গলে সাত দশমিক ছয় মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। আবার ১৮৮৫ সালে বগুড়ার শেরপুর এলাকায় সাত দশমিক এক মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। এই অঞ্চলগুলো ঢাকা থেকে দেড়শো থেকে দু’শো কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে অবস্থিত। অর্থাৎ বড় ভূমিকম্পের কেন্দ্র ঢাকার ভেতরে না হলেও ঢাকার ওপর তার প্রভাব মারাত্মক হতে পারে।
অধ্যাপক আনসারীর ব্যাখ্যায়, প্রতিটি ভূমিকম্পের একটি পুনরাবৃত্তির চক্র থাকে। ঢাকা থেকে ২৩০ কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে যে বড় ভূমিকম্প হয়েছিল, সেটির পুনরাবৃত্তির হিসাব প্রায় সাড়ে ৩০০ বছর। সেই হিসাবে সেটি হয়তো ২২৫০ সালের আশেপাশে হতে পারে। তবে সাত মাত্রার ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে দেড়শো থেকে দুইশো বছরের মধ্যে পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা থাকে।
তিনি আরও বলেছেন, সাত মাত্রার ভূমিকম্প হয়তো অতীতেও হয়েছে, কিন্তু সব তথ্য গবেষকদের হাতে নেই। এ কারণেই সাত মাত্রার একটি ভূমিকম্প ঢাকায় শীঘ্রই আসার সম্ভাবনার কথা বলা হয়। তবে এটি কবে হবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। ২০ বছরও লেগে যেতে পারে।
নরসিংদীর কম্পন কি আলাদা সংকেত?
সাম্প্রতিক সময়ে নরসিংদী ও আশপাশে যেভাবে একের পর এক ভূমিকম্পের উৎপত্তি হচ্ছে, তাতে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগছে—এটি কি বড় কোনো ভূমিকম্পের আগাম ইঙ্গিত? অধ্যাপক আনসারীর মতে, এমন সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে বর্তমানে যে তথ্য-উপাত্ত আছে, তাতে ঐতিহাসিকভাবে নরসিংদীতে বড় কোনো ভূমিকম্পের রেকর্ড পাওয়া যায় না।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, নরসিংদী বা ঢাকার আশপাশে সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের হিসাব ধরে ঢাকা ঝুঁকিপূর্ণ বলা কঠিন। কিন্তু অতীতের বড় ভূমিকম্পগুলোর বিচারে ঢাকা অবশ্যই ঝুঁকিতে আছে। বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে বাংলাদেশের কয়েকশো কোটি মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে।
ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবায়েত কবীরও বলেছেন, ঢাকাকেন্দ্রিক বড় ভূমিকম্পের ইতিহাস নেই। তবে সীমান্ত অঞ্চলে বড় ভূমিকম্পের ইতিহাস আছে। তার অভিজ্ঞতায়, গত বছর দুয়েক ধরে এই অঞ্চলে ভূমিকম্পপ্রবণতা কিছুটা বেশি দেখা যাচ্ছে।
ঢাকার কোন এলাকা তুলনামূলক নিরাপদ?
ভূমিকম্পে কোনো এলাকা কতটা নিরাপদ, তা বোঝার জন্য দুটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, এলাকার ভূতাত্ত্বিক গঠন। দ্বিতীয়ত, ভবন ও অবকাঠামোর মান।
ভূতত্ত্ববিদ সৈয়দ হুমায়ুন আখতারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ঢাকা ও আশপাশের এলাকার ভূতাত্ত্বিক গঠন মোটামুটি একই রকম। বিশেষ করে উত্তর দিকের বড় অংশ মধুপুরের লাল মাটির ওপর দাঁড়িয়ে, যা তুলনামূলক শক্ত। এই দিক থেকে রমনা, মগবাজার, নিউমার্কেট, লালমাটিয়া, খিলগাঁও, মতিঝিল, ধানমন্ডি, লালবাগ, মিরপুর, গুলশান ও তেজগাঁওয়ের মতো এলাকা তুলনামূলক নিরাপদ বলে বিবেচিত হতে পারে।
তবে এই নিরাপত্তা শুধু মাটির ওপর নির্ভর করে না। ভবনের নকশা, নির্মাণমান, বয়স, ব্যবহৃত উপকরণ, অনুমোদন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং জরুরি বের হওয়ার পথ—এসবই বড় ভূমিকা রাখে।
অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারীর মতে, ঢাকার কোন এলাকা নিরাপদ আর কোনটি অনিরাপদ, তা পরীক্ষা ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। যতক্ষণ না ভবনগুলো পরীক্ষা করা হবে, ততক্ষণ কোনো ভবনকে ঝুঁকিমুক্ত বলা কঠিন।
অনেকে পুরান ঢাকাকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেন। কিন্তু অধ্যাপক আনসারীর মতে, পুরান ঢাকা ও নতুন ঢাকার বড় পার্থক্য মূলত রাস্তার প্রস্থে। পুরান ঢাকার সরু রাস্তাগুলো দুর্যোগের সময় উদ্ধারকাজ ও মানুষ সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হতে পারে। তবে পুরনো কিছু ভবন শত বছরেরও বেশি সময় ধরে টিকে আছে এবং বিভিন্ন কম্পনেও ভেঙে পড়েনি। তাই শুধু ভবন পুরনো হলেই তা বিপজ্জনক, আর নতুন হলেই নিরাপদ—এমন সরল সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
জলাশয় ভরাট করে তৈরি এলাকাগুলোর ঝুঁকি
ঢাকার সম্প্রসারণের ইতিহাসও ঝুঁকির সঙ্গে জড়িত। মোগল আমল থেকে শুরু করে ব্রিটিশ শাসন, পাকিস্তান আমল এবং স্বাধীনতার পর উত্তর দিক ও বুড়িগঙ্গা নদী ঘিরে শহর দ্রুত বাড়তে থাকে। পরবর্তী সময়ে পূর্ব ও পশ্চিম দিকে নগর বিস্তার শুরু হয়। এসব এলাকার অনেক জায়গায় নরম পলিমাটি ও জলাশয় ছিল, যা ভরাট করে আবাসিক এলাকা গড়ে তোলা হয়েছে।
নরম মাটি, ভরাট জমি ও দুর্বল ভিত্তির ওপর তৈরি ভবন ভূমিকম্পের সময় বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারে। মাটি কাঁপলে এ ধরনের এলাকায় কম্পন বাড়তি মাত্রায় অনুভূত হতে পারে। ফলে শুধু ভবন নয়, পুরো এলাকার ভূমিগত বৈশিষ্ট্যও বিবেচনায় রাখা জরুরি।
ঢাকার ভেতরে চ্যুতি রেখা নেই, তবু বিপদ আছে
বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার ভেতরে সরাসরি কোনো বড় চ্যুতি রেখা নেই। তবে বাংলাদেশের ভূমিকম্প ঝুঁকির জন্য পরিচিত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল আছে।
প্রথমটি বার্মা বা মিয়ানমার থেকে নোয়াখালী পর্যন্ত বিস্তৃত একটি ভূত্বকীয় ফলক সীমানা। সেখানে ১৭৬২ সালে আট দশমিক পাঁচ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল।
দ্বিতীয়টি আরেকটি ফলক সীমানা, যা নরসিংদীর ওপর দিয়ে গেছে। অতীতে এখানে সাত মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
তৃতীয় অঞ্চলটি সিলেট থেকে ভারতের দিকে বিস্তৃত। এখানে ১৯১৮ এবং ১৯৬৯ সালে সাত দশমিক পাঁচ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল।
চতুর্থটি ডাউকি চ্যুতি রেখা। সেখানে ১৮৯৭ সালে আট দশমিক এক মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল।
পঞ্চমটি মধুপুর চ্যুতি রেখা। এখানে ১৮৮৫ সালে সাত দশমিক এক মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল।
গবেষকদের মতে, এসব অঞ্চলের কিছু জায়গায় ৩৫০ বছর, আবার কিছু জায়গায় ৯০০ বছরের মতো সময় পরে বড় ভূমিকম্প হতে পারে। অর্থাৎ ভূমিকম্পের ঝুঁকি সময়ের সঙ্গে জমে থাকে। কখন, কোথায়, কত বড় কম্পন হবে—তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন হলেও ইতিহাস, ভূতত্ত্ব ও বর্তমান কম্পনের ধরন ঝুঁকির ধারণা দেয়।
অদৃশ্য চ্যুতি: নীরব বিপদের আরেক নাম
পরিচিত চ্যুতি রেখার বাইরেও কিছু চ্যুতি থাকে, যেগুলো ভূপৃষ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছায় না। ভূপৃষ্ঠে সরাসরি কোনো চিহ্ন না থাকায় সাধারণ মানচিত্রে এগুলো সহজে দেখা যায় না। এগুলোকে অদৃশ্য চ্যুতি বলা যায়। এ ধরনের চ্যুতি বিপজ্জনক, কারণ এগুলো শনাক্ত করা কঠিন এবং আগে থেকে সতর্ক হওয়াও কঠিন।
বাংলাদেশে এমন দুটি চিহ্নিত অদৃশ্য চ্যুতি আছে। একটি ময়মনসিংহে, অন্যটি রংপুরে। ঢাকার জন্য এসব অদৃশ্য চ্যুতিও সম্ভাব্য ঝুঁকির অংশ হতে পারে।
ঢাকার আসল দুর্বলতা কোথায়?
ঢাকার ভূমিকম্পঝুঁকি শুধু ভূতত্ত্বের প্রশ্ন নয়; এটি নগর ব্যবস্থাপনারও প্রশ্ন। রাজধানীতে অসংখ্য ভবন আছে, যেগুলো নির্মাণবিধি মেনে তৈরি হয়েছে কি না তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। অনেক ভবনের নকশা অনুমোদিত হলেও নির্মাণের সময় মান বজায় রাখা হয়নি। কোথাও অতিরিক্ত তলা তোলা হয়েছে, কোথাও ভবনের ব্যবহার বদলেছে, কোথাও জরুরি সিঁড়ি বন্ধ বা অকার্যকর।
ভূমিকম্পের সময় সবচেয়ে বড় বিপদ সাধারণত কম্পন নয়, দুর্বল অবকাঠামো। ভবন ভেঙে পড়া, আগুন লাগা, গ্যাসলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, সরু রাস্তার কারণে উদ্ধারকাজ আটকে যাওয়া—এসবই প্রাণহানি বাড়াতে পারে। ২০২৫ সালের ২১শে নভেম্বরের ভূমিকম্পে যে প্রাণহানি ও আহতের ঘটনা ঘটেছে, তা দেখিয়েছে মাঝারি মাত্রার কম্পনও শহুরে বাস্তবতায় গুরুতর ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।
কী করা জরুরি?
প্রথমত, ঢাকার ঝুঁকিপূর্ণ ভবন দ্রুত শনাক্ত করা প্রয়োজন। শুধু পুরান ঢাকা নয়, নতুন ঢাকার বহুতল ভবনও পরীক্ষা করতে হবে। ভবন নিরাপদ কি না, তা অনুমান করে বলা যাবে না; প্রকৌশলগত পরীক্ষা দরকার।
দ্বিতীয়ত, স্কুল, হাসপাতাল, বাজার, বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন, সরকারি দপ্তর এবং ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক ভবনের নিরাপত্তা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, জলাশয় ভরাট করে গড়ে ওঠা এলাকায় ভূমির গুণাগুণ ও ভবনের ভিত্তি আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
চতুর্থত, দুর্যোগের সময় মানুষ কোথায় যাবে, কীভাবে বের হবে, কোন রাস্তা ব্যবহার হবে—এসব নিয়ে এলাকাভিত্তিক পরিকল্পনা দরকার।
পঞ্চমত, সাধারণ মানুষের মধ্যে নিয়মিত মহড়া ও সচেতনতা তৈরি করতে হবে। ভূমিকম্পের সময় আতঙ্কিত হয়ে সিঁড়ি বা লিফটে ভিড় করলে ক্ষতি বাড়তে পারে। তাই পরিবার, প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক প্রস্তুতি থাকা জরুরি।
ভয় নয়, প্রস্তুতিই মূল কথা
ঢাকার কাছাকাছি সাম্প্রতিক ভূমিকম্পগুলো সরাসরি বড় ভূমিকম্পের নিশ্চিত পূর্বাভাস—এমন কথা বলা যায় না। আবার এগুলোকে সম্পূর্ণ সাধারণ ঘটনা বলে উড়িয়ে দেওয়াও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কারণ ঢাকার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বহু স্তরে—ভূতাত্ত্বিক অবস্থান, ঐতিহাসিক বড় ভূমিকম্পের রেকর্ড, দুর্বল নগর পরিকল্পনা, অনিরাপদ ভবন, ভরাট জমি এবং উদ্ধারকাজের সীমাবদ্ধতা মিলিয়ে।
ভূমিকম্প থামানো মানুষের হাতে নেই। কিন্তু ক্ষয়ক্ষতি কমানো মানুষের হাতেই আছে। ঢাকার জন্য তাই সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো আতঙ্ক নয়, প্রস্তুতি। ছোট ও মাঝারি কম্পনগুলোকে সতর্কবার্তা হিসেবে ধরে এখনই ভবন পরীক্ষা, নগর পরিকল্পনা, উদ্ধারব্যবস্থা ও জনসচেতনতা শক্তিশালী করা দরকার।
কারণ বড় দুর্যোগ যখন আসে, তখন প্রস্তুতির সময় থাকে না। প্রস্তুতি নিতে হয় তার আগেই।

