সরকারি চাকরি থেকে অবসরের পর পেনশন পেতে দীর্ঘসূত্রতা, অফিসে বারবার যাতায়াত এবং নানা প্রশাসনিক জটিলতার অভিযোগ বহুদিনের। সেই ভোগান্তি কমাতে এবার ‘অনলাইন পেনশন ট্র্যাকিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (ওপিটিএমএস)’ চালু করেছে সরকার। সংশ্লিষ্টদের আশা, নতুন এই ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে পেনশন আবেদন ও মঞ্জুরির পুরো প্রক্রিয়া হবে আরও স্বচ্ছ, দ্রুত এবং জবাবদিহিমূলক।
গতকাল মঙ্গলবার (২৩ জুন) বাংলাদেশ সচিবালয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে এ বিষয়ে আয়োজিত এক কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জনপ্রশাসন ও খাদ্য প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী এ তথ্য জানান।
অর্থ বিভাগের ‘স্ট্রেনদেনিং পাবলিক ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমস (এসপিএফএমএস)’ কর্মসূচির আওতায় কর্মশালাটির আয়োজন করা হয়। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো অবসরের আগের পেনশন-সংক্রান্ত কার্যক্রমকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল কাঠামোর মধ্যে আনা, যাতে আবেদনকারীদের অপ্রয়োজনীয়ভাবে বিভিন্ন দপ্তরে যেতে না হয় এবং পুরো প্রক্রিয়াটি সহজ ও স্বচ্ছ থাকে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, পেনশন সংক্রান্ত কাজে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রায়ই নানা প্রশাসনিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি অফিসে যেতে হয়, যা সময় ও শ্রম দুটিই বাড়ায়। ওপিটিএমএস পুরোপুরি কার্যকর হলে পেনশনাররা অনলাইনের মাধ্যমে নিজেদের আবেদনের সর্বশেষ অবস্থা জানতে পারবেন। এতে সময় সাশ্রয়ের পাশাপাশি হয়রানিও কমবে। তিনি আরও বলেন, সরকারি সেবাগ্রহীতারা যদি সরাসরি অফিসে না গিয়ে অনলাইনে সেবা গ্রহণ করতে পারেন, তাহলে তা দুর্নীতি কমানোর ক্ষেত্রেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী শতভাগ পেনশন সমর্পণকারী অবসরপ্রাপ্তদের বিষয়টিও তুলে ধরেন। বর্তমানে কোনো পেনশনার অবসরের ১৫ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে মারা গেলে তার পরিবার পুনর্বহাল সুবিধা পায় না। এই নীতিমালা পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মত দেন, যাতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো ন্যায়সঙ্গত সুবিধা পেতে পারে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহসানুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার এবং মহা হিসাব নিয়ন্ত্রক এস এম রেজভী। স্বাগত বক্তব্য দেন অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ও এসপিএফএমএসের জাতীয় কর্মসূচি পরিচালক ড. জিয়াউল আবেদীন।
কর্মশালায় জানানো হয়, প্রাথমিকভাবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পরীক্ষামূলকভাবে এই সিস্টেম চালু করা হবে। পরবর্তী সময়ে হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়সহ অন্যান্য মন্ত্রণালয় এবং মাঠপর্যায়ের সরকারি দপ্তরগুলোতেও এটি সম্প্রসারণ করা হবে।
নতুন ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো স্বয়ংক্রিয় খুদে বার্তা সেবা। কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর অবসরোত্তর ছুটি (পিআরএল) শুরুর ১১ মাস আগে থেকেই তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বার্তা পাবেন। ফলে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ থাকবে এবং পেনশন প্রক্রিয়া শুরু করতে বিলম্ব হবে না। এ ছাড়া আবেদনকারীরা অনলাইনে তাৎক্ষণিকভাবে নিজেদের ফাইলের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। ফলে কোন পর্যায়ে আবেদন রয়েছে, তা জানতে আলাদা করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগের প্রয়োজন হবে না।
সিস্টেমটি আইবিএএস প্লাস প্লাস থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চাকরির তথ্য ও আর্থিক বিবরণ সংগ্রহ করবে। এর ফলে তথ্যগত ভুলের ঝুঁকি কমবে এবং আবেদন প্রক্রিয়া আরও নির্ভুল হবে। পাশাপাশি ফাইল হাতে নিয়ে এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ঘোরার প্রয়োজনও অনেকাংশে দূর হবে।
অর্থ সচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদার বলেন, অবসরের পর অনেক সরকারি কর্মচারী নিজেদের অনিশ্চয়তার মধ্যে অনুভব করেন। নতুন এই ডিজিটাল ব্যবস্থা তাদের মধ্যে আস্থা বাড়াবে। একই সঙ্গে তিনি অবসরপ্রাপ্তদের আর্থিক নিরাপত্তা জোরদারে ‘ওয়ান র্যাংক, ওয়ান পেনশন’ ব্যবস্থা চালুর গুরুত্বও তুলে ধরেন।
মহা হিসাব নিয়ন্ত্রক এস এম রেজভী জানান, পেনশন-পরবর্তী ব্যবস্থাপনার অনেক অংশ ইতোমধ্যে ডিজিটাল করা হয়েছে। বর্তমানে ইলেকট্রনিক তহবিল স্থানান্তরের মাধ্যমে সরাসরি ব্যাংক হিসাবে অর্থ পাঠানো হচ্ছে। নতুন সিস্টেমটি পেনশনের আগের ধাপগুলোকে আরও সহজ ও গতিশীল করবে।
কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এসপিএফএমএসের প্রোগ্রাম এক্সিকিউটিভ ড. মাহফুজা বেগম। সেখানে অফিস ম্যাপিং, অনাপত্তিপত্র সংগ্রহ এবং নিরীক্ষা আপত্তি নিষ্পত্তিসহ বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের বিষয়ও তুলে ধরা হয়। বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে সরকারি পেনশন সেবা আরও দ্রুত, কার্যকর এবং নাগরিকবান্ধব হয়ে উঠবে।

