দেশের কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। অনুমোদিত মোট শিক্ষকের পদের অর্ধেকেরও বেশি বর্তমানে শূন্য রয়েছে। একই সময়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা ও আনন্দময় শিখন নিশ্চিত করতে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে দুটি নতুন পাঠ্যপুস্তক চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে সরকার। নতুন বই দুটি হলো ‘কারিগরি শিক্ষা’ এবং ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’।
রোববার জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে বিভিন্ন সংসদ সদস্যের লিখিত প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক এসব তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের আওতাধীন কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অনুমোদিত শিক্ষক পদ রয়েছে ১৫ হাজার ৮৪৪টি। এর মধ্যে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৭ হাজার ৭৪ জন শিক্ষক। ফলে ৮ হাজার ৪৮৬টি পদ এখনো খালি রয়েছে, যা শিক্ষা কার্যক্রমে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিনের এই শিক্ষক সংকট দূর করতে নিয়োগ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে দুই হাজার ২০৪টি শূন্য পদে শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ চেয়ে সরকারি কর্ম কমিশনে (পিএসসি) চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি ৪৫তম বিসিএসের মাধ্যমে ৯৭ জন ক্যাডার এবং ৩৪৯ জন নন-ক্যাডার শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করেছে পিএসসি। পুলিশ ভেরিফিকেশন সম্পন্ন হওয়ার পর তাঁদের নিয়োগ দেওয়া হবে।
তিনি আরও জানান, শুধু নতুন নিয়োগ নয়, পদোন্নতির মাধ্যমেও শূন্য পদ পূরণের উদ্যোগ রয়েছে। তবে বর্তমানে পদোন্নতির জন্য নির্ধারিত চার হাজার ১৩১টি পদেও প্রয়োজনীয় কর্মকর্তা ও কর্মচারী না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে পদোন্নতি কার্যকর করা যাচ্ছে না।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আগামী প্রজন্মকে শুধু পাঠ্যবইনির্ভর নয়, বাস্তবমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষায় গড়ে তুলতে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে ষষ্ঠ শ্রেণির সাধারণ ধারার শিক্ষার্থীদের জন্য ‘কারিগরি শিক্ষা’ নামে নতুন একটি পাঠ্যপুস্তক চালু করা হবে। এই বইয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা কারিগরি শিক্ষার বিভিন্ন শাখা, কর্মমুখী দক্ষতা, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং উচ্চশিক্ষার সম্ভাবনা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা লাভ করবে।
একই শিক্ষাবর্ষ থেকে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ নামে আরেকটি নতুন বইও ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হবে। মন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, এই বইয়ের মূল লক্ষ্য হবে শিক্ষার্থীদের শেখার পরিবেশকে আরও আনন্দময় ও অংশগ্রহণমূলক করা। পাশাপাশি সৃজনশীল চিন্তা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা, আত্মপ্রকাশের দক্ষতা এবং বহুমাত্রিক প্রতিভা বিকাশেও বইটি সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
সংসদে শিক্ষামন্ত্রী আরও জানান, পাহাড়ি অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা দূর করতে মাতৃভাষাভিত্তিক বহুভাষিক শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। বর্তমানে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও সাদরি—এই পাঁচটি ভাষায় শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর ফলে মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ বাড়বে এবং শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার প্রবণতাও কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এছাড়া অতীতে দায়ের হওয়া বিভিন্ন ফৌজদারি মামলার কারণে যেসব এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও কর্মচারীর বেতন-ভাতার বকেয়া সৃষ্টি হয়েছে, সেসব বকেয়া আইন ও বিধি অনুযায়ী পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও আবেদন জমা দিলে বিধি অনুযায়ী তাঁদের পাওনা অর্থ পরিশোধের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
সংসদে উচ্চশিক্ষা সম্পর্কিত তথ্য তুলে ধরে শিক্ষামন্ত্রী জানান, বর্তমানে দেশে মোট ১৭৪টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ৫৬টি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ১১৬টি এবং আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ২টি। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সাধারণ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, প্রকৌশল, কৃষি, মেডিকেল এবং অন্যান্য বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যে নতুন পাঠ্যপুস্তক চালু করা ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও শিক্ষক সংকট দ্রুত সমাধান না হলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে। তাদের মতে, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, আধুনিক প্রশিক্ষণ, উন্নত অবকাঠামো এবং যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে কারিগরি শিক্ষাকে আরও কার্যকর করে তুলতে হবে। একই সঙ্গে সাধারণ শিক্ষায় দক্ষতাভিত্তিক বিষয় সংযোজন ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের জন্য শিক্ষার্থীদের আরও প্রস্তুত করে তুলবে বলে তারা মনে করেন।

