বাংলাদেশের বিমান চলাচল ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের একটি সীমাবদ্ধতা ছিল আকাশসীমার পূর্ণাঙ্গ নজরদারি নিশ্চিত করা। আধুনিক প্রযুক্তির অভাবে দেশের আকাশপথ ব্যবহার করেও কিছু বিদেশি উড়োজাহাজকে পুরোপুরি পর্যবেক্ষণে আনা সম্ভব হতো না। এর ফলে নিরাপত্তার পাশাপাশি রাজস্ব আদায়েও ঘাটতি তৈরি হতো। তবে সেই পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নতুন এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল (এটিসি) টাওয়ার চালুর মাধ্যমে।
অত্যাধুনিক রাডার প্রযুক্তি ও আধুনিক বিমান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালুর পর দেশের পুরো আকাশসীমা এখন কার্যত সার্বক্ষণিক নজরদারির আওতায় এসেছে। এর ইতিবাচক প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে ফ্লাইং ওভার চার্জ বা বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহারের বিপরীতে আদায় হওয়া রাজস্বে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে নতুন এটিসি টাওয়ার ও উন্নত রাডার ব্যবস্থার নির্মাণকাজ শেষ হয়। এরপর পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর নিয়মিতভাবে এটি চালু করা হয়। চলতি বছরের ২০ এপ্রিল বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম আনুষ্ঠানিকভাবে এই টাওয়ারের উদ্বোধন করেন।
এরপর থেকেই রাজস্ব আদায়ে ধারাবাহিক ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ফ্লাইং ওভার চার্জ থেকে সরকারের আয় হয়েছিল ১৫৭ কোটি ১৫ লাখ ৫৮ হাজার ৬৬০ টাকা। ২০২৫ সালের একই সময়ে সেই আয় বেড়ে দাঁড়ায় ১৮৪ কোটি ৫৩ লাখ ১২ হাজার ৭৬১ টাকায়। আর ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে এই আয় আরও বৃদ্ধি পেয়ে ১৯৯ কোটি ২৮ লাখ ৭৩ হাজার ৮১০ টাকায় পৌঁছেছে।
মাসভিত্তিক হিসাবও একই প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে যেখানে এই খাতে রাজস্ব ছিল ৫৩ কোটি ৫৯ লাখ ৭ হাজার ৫৮০ টাকা, সেখানে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তা বেড়ে হয় ৬৭ কোটি ৯৩ লাখ ৫৪ হাজার ৭৭৮ টাকা। চলতি বছরের জানুয়ারিতে রাজস্ব দাঁড়িয়েছে ৮০ কোটি ১৬ লাখ ৫৬ হাজার ২৬৬ টাকায়। অর্থাৎ মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে জানুয়ারি মাসেই অতিরিক্ত ২৬ কোটি ৫৭ লাখ ৪৮ হাজার ৬৮৬ টাকা রাজস্ব এসেছে।
ফেব্রুয়ারিতেও একই ধারা অব্যাহত রয়েছে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আয় হয়েছিল ৪৭ কোটি ৪৩ লাখ ৯৭ হাজার ৮০ টাকা। ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয় ৫৮ কোটি ২৯ লাখ ৭৯ হাজার ১১৩ টাকা। আর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই আয় পৌঁছায় ৬৯ কোটি ৫৮ লাখ ২৬ হাজার ২২৬ টাকায়। ফলে দুই বছরের ব্যবধানে শুধু ফেব্রুয়ারি মাসেই প্রায় ২২ কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব এসেছে।
মার্চ মাসেও প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। ২০২৪ সালের মার্চে রাজস্ব ছিল ৫৬ কোটি ১২ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৮ কোটি ২৯ লাখ ৭৮ হাজার ৮৭০ টাকায়। আর ২০২৬ সালের মার্চে আয় আরও বেড়ে ৬২ কোটি ১৭ লাখ ৮০ হাজার ১০৮ টাকায় পৌঁছেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এই প্রবৃদ্ধির মূল কারণ আধুনিক এটিসি টাওয়ার ও উন্নত রাডার প্রযুক্তি। আগে পুরোনো রাডারের সীমিত সক্ষমতার কারণে বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন আকাশসীমার একটি বড় অংশ কার্যকর নজরদারির বাইরে থাকত। ফলে বাংলাদেশের আকাশপথ ব্যবহার করলেও কিছু উড়োজাহাজের কাছ থেকে নির্ধারিত ফি আদায় করা যেত না।
আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, কোনো বিদেশি উড়োজাহাজ একটি দেশের আকাশসীমা ব্যবহার করলে সেই দেশের কাছে ফ্লাইং ওভার চার্জ পরিশোধ করতে হয়। নতুন প্রযুক্তি চালুর ফলে এখন সেই প্রক্রিয়া অনেক বেশি নির্ভুল ও কার্যকর হয়েছে। আগে যেসব উড়োজাহাজ নজরদারির বাইরে থেকে যেত, সেগুলোও এখন পর্যবেক্ষণের আওতায় আসছে। ফলে রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
নতুন ব্যবস্থায় স্থাপিত এস-ব্যান্ড প্রাইমারি রাডার ৮০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত আকাশসীমা পর্যবেক্ষণ করতে পারে। পাশাপাশি মোড-এস সেকেন্ডারি সার্ভেল্যান্স রাডার ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত নজরদারির সক্ষমতা দিয়েছে। ফলে দেশের আকাশপথের প্রায় পুরো অংশ এখন উন্নত প্রযুক্তির আওতায় রয়েছে।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা বলছেন, আধুনিক এই প্রযুক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণকক্ষ এখন তাৎক্ষণিক তথ্য পাচ্ছে। এতে বিমান চলাচল পর্যবেক্ষণ, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ফ্লাইট ব্যবস্থাপনা এবং আকাশপথের নিরাপত্তা আগের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর হয়েছে। একই সঙ্গে আকাশসীমার সর্বোচ্চ ব্যবহারও নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে।
এই প্রকল্পের সূচনা হয়েছিল ২০১৮ সালের ১০ সেপ্টেম্বর, যখন ফ্রান্সের থ্যালেস কোম্পানি বাংলাদেশে আধুনিক রাডার, এটিএম-সিএনএস ব্যবস্থা, এটিসি টাওয়ার এবং এটিএম পরিচালনা কেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব দেয়। আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের নিরাপত্তা মান নিশ্চিত করতে ২০১৯ সালের ৮ মে অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটি সরকার-টু-সরকার ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের অনুমোদন দেয়। পরবর্তীতে কারিগরি মূল্যায়ন, আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার মতামত গ্রহণ এবং বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে প্রকল্পটি এগিয়ে যায়। পরে সরকারি অর্থায়নের পরিবর্তে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এর কাজ সম্পন্ন হয়।
প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৭৩০ কোটি টাকা। তবে বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত মোট ব্যয় দাঁড়ায় ৯৪২ কোটি টাকায়। পুরো অর্থই বহন করেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ।
বেবিচকের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) কাওছার মাহমুদ বলেন, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এই টাওয়ার দেশের বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় নতুন যুগের সূচনা করেছে। এর ফলে শুধু ফ্লাইট পরিচালনাই আরও নিরাপদ হয়নি, বরং দেশের পুরো আকাশসীমাই এখন সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের আওতায় এসেছে। তাই কোনো বিমান আর রাডারের নজর এড়িয়ে চলাচল করতে পারবে না।
একই ধরনের মন্তব্য করেছেন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগিব সামাদও। তাঁর ভাষ্য, নতুন এটিসি টাওয়ার চালুর পর ফ্লাইং ওভার চার্জ আদায়ের হার স্পষ্টভাবে বেড়েছে। পাশাপাশি দেশের আকাশসীমায় পূর্ণাঙ্গ নজরদারি নিশ্চিত হওয়ায় কোনো উড়োজাহাজের পক্ষে রাডার এড়িয়ে প্রবেশ করা এখন আর সম্ভব নয়। তাঁর মতে, এটি বাংলাদেশের বিমান চলাচল ব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এটিসি টাওয়ার শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এটি বাংলাদেশের বিমান নিরাপত্তা, আকাশসীমা ব্যবস্থাপনা এবং বৈদেশিক রাজস্ব বৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটি কৌশলগত বিনিয়োগ। আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তির কারণে নিরাপত্তা যেমন শক্তিশালী হয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক আকাশপথ ব্যবহারের বিপরীতে সরকারের আয়ও ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেলে এই খাত থেকে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।

