জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হলে তা বর্তমান সরকারের জন্যই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেছেন, প্রস্তাবিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন-২০২৬ বর্তমান খসড়া অনুযায়ী পাস হলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর মানবাধিকার কমিশন গঠন সম্ভব হবে না।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে টিআইবির কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন-২০২৬ (খসড়া) পর্যালোচনা ও সুপারিশ’ শীর্ষক এক সভায় তিনি এসব কথা বলেন। সভার আয়োজন করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ (এইচআরএফবি)।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারের প্রস্তাবিত খসড়া আইনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যদি সরকারনিয়ন্ত্রিত এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতাহীন একটি কমিশন গঠন করা হয়, তাহলে তা শুধু মানবাধিকার সুরক্ষাকেই দুর্বল করবে না, বরং সরকারের জন্যও দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক পরিণতি ডেকে আনবে।
তিনি বলেন, বিশ্বের অনেক দেশে কর্তৃত্ববাদী সরকার থাকলেও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবে অকার্যকর করে দেওয়ার ঘটনা তুলনামূলক কম। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকারের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি। তাই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল না করে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, যে সরকার বা রাজনৈতিক শক্তি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় প্রভাবে পরিচালিত করে, শেষ পর্যন্ত সেই অকার্যকর প্রতিষ্ঠানের নেতিবাচক প্রভাব তাদেরই মোকাবিলা করতে হয়। কারণ কোনো সরকারই চিরস্থায়ী নয়।
সভায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন-২০২৬-এর খসড়া পর্যালোচনা করে ১৯টি সুপারিশ তুলে ধরে টিআইবি। সংস্থাটির দাবি, এসব সুপারিশ বিবেচনায় না নিয়ে আইন পাস করা হলে সরকারের স্বাধীন ও কার্যকর মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি প্রশ্নের মুখে পড়বে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সরকারের ঘোষিত রাষ্ট্রসংস্কার কর্মসূচি, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং সংস্কার-সংক্রান্ত অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করা হলে সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত একটি স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অনেক সময় সরকারের ভেতরেই পরিবর্তনবিরোধী একটি অংশ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল রাখার পক্ষে ভূমিকা রাখে। রাজনৈতিক প্রভাবের পাশাপাশি আমলাতান্ত্রিক প্রভাবও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যার প্রতিফলন বর্তমান খসড়া আইনেও দেখা যাচ্ছে।
খসড়া আইনের কয়েকটি ধারা নিয়ে নির্দিষ্ট আপত্তিও তুলে ধরে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, খসড়ার ১৩ নম্বর ধারায় কমিশনের তদন্ত ও পরিদর্শনের ক্ষমতার মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা বা কথিত গোপন আটককেন্দ্র পরিদর্শনের বিষয়টি স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে গোপন আটক বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ কার্যকরভাবে তদন্তে কমিশনের সক্ষমতা সীমিত হতে পারে।
এ ছাড়া খসড়ার ২০ নম্বর ধারায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে কমিশনের ক্ষমতা সীমিত রাখার প্রস্তাবেরও সমালোচনা করেছে টিআইবি। সংস্থাটির মতে, এসব বিধান বহাল থাকলে কমিশনের স্বাধীন তদন্ত পরিচালনা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে।
টিআইবির অভিমত, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী কার্যকর ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হলে প্রস্তাবিত আইন পুনর্বিবেচনা করে কমিশনের তদন্ত, তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষমতা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

