ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির রাষ্ট্রীয় জানাজা ও শোকানুষ্ঠানে অংশ নিতে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল তেহরানে পৌঁছেছে। ইরান সরকারের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণে সফররত এই প্রতিনিধিদল ৩ জুলাই থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে অংশ নেবে।
জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দলের নায়েবে আমির ও সংসদ সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। তার সঙ্গে রয়েছেন কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য ও রাজশাহী মহানগরী আমির মো. কেরামত আলী, মো. নুরুল আমীন, পীরজাদা সাইদ উদ্দিন আহমাদ হানজালা, ডা. এস এম খালিদুজ্জামান এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার প্রথম দিনেই নিহত হন আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। এরপর দীর্ঘ সময় নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে দাফন ও রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান পিছিয়ে দেওয়া হয়। অবশেষে জুলাই মাসে শুরু হয়েছে তার রাষ্ট্রীয় বিদায় অনুষ্ঠান, যা ইরানের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জাতীয় আয়োজনগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইরান সরকার খামেনির স্মরণে ছয় দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় কর্মসূচির আয়োজন করেছে, যা ইরান ও প্রতিবেশী ইরাকের মোট পাঁচটি শহরে অনুষ্ঠিত হবে। রাজধানী তেহরানকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই কর্মসূচিতে লাখো মানুষের অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের ধারণা, পুরো শোকানুষ্ঠানে এক থেকে দুই কোটি মানুষের সমাগম হতে পারে।
ইরানের কর্মকর্তারা এই আয়োজনকে শুধু ধর্মীয় বা রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান হিসেবে দেখছেন না; বরং এটিকে দেশটির জাতীয় ঐক্য ও রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতীক হিসেবেও তুলে ধরছেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতের পর এই বিপুল জনসমাগমকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে তেহরান।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ দেশবাসীর প্রতি ব্যাপকভাবে জানাজায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, জনগণের উপস্থিতিই হবে দেশের দৃঢ় অবস্থান, জাতীয় সংহতি এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতি সমর্থনের বহিঃপ্রকাশ।
এদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, খামেনির রাষ্ট্রীয় বিদায় অনুষ্ঠানে বিশ্বের প্রায় ১০০টি দেশের প্রতিনিধিদল অংশ নেবে। তার তথ্য অনুযায়ী, অন্তত আটটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধান, ১২টি দেশের পার্লামেন্টের স্পিকার এবং বিভিন্ন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, মন্ত্রী ও বিশেষ দূত অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও অংশগ্রহণ করবেন।
বাঘাই আরও জানান, প্রতিবেশী দেশগুলোর পাশাপাশি পূর্ব ইউরোপের কয়েকটি দেশের সরকারি প্রতিনিধি ও সংসদ সদস্যদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবে যেসব ইউরোপীয় দেশ ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছিল, তাদের এই রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, খামেনির জানাজা ও রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান শুধু একটি ধর্মীয় বা জাতীয় বিদায়ের অনুষ্ঠান নয়; বরং সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এটি ইরানের কূটনৈতিক অবস্থান, আন্তর্জাতিক সমর্থন এবং আঞ্চলিক মিত্রদের উপস্থিতি প্রদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ সেই বাস্তবতাকেই আরও স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।

