বিশ্বজুড়ে আর্থিক স্বচ্ছতা ও অর্থপাচার প্রতিরোধ নিয়ে যখন নজরদারি আরও জোরদার হচ্ছে, ঠিক তখনই আন্তর্জাতিক এক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান কিছুটা উদ্বেগের ইঙ্গিত দিয়েছে। আর্থিক গোপনীয়তা বা অর্থের প্রকৃত মালিকানা আড়াল করার সুযোগ কতটা রয়েছে—সেই মূল্যায়নে বাংলাদেশ এবার বিশ্বের ৪৭তম অবস্থানে উঠে এসেছে। গত বছর দেশের অবস্থান ছিল ৫০তম। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে তিন ধাপ ওপরে উঠে এসেছে বাংলাদেশ।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ট্যাক্স জাস্টিস নেটওয়ার্ক গত ২৩ জুন প্রকাশিত তাদের আর্থিক গোপনীয়তা সূচক ২০২৬-এ এই তথ্য তুলে ধরেছে। সংস্থাটির মতে, এই পরিবর্তন ইঙ্গিত করে যে বাংলাদেশের আইন, নীতিমালা এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোয় এমন কিছু দুর্বলতা রয়েছে, যা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক তথ্য গোপন রাখার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে এই সূচকে ওপরে উঠে আসা কোনো ইতিবাচক অর্জন নয়। বরং এটি বোঝায়, একটি দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় এমন পরিবেশ বিদ্যমান, যেখানে সম্পদের প্রকৃত মালিকানা বা অর্থের উৎস গোপন রাখার সুযোগ তুলনামূলকভাবে বেশি।
এবারের তালিকায় বিশ্বের সবচেয়ে বেশি আর্থিক গোপনীয়তা নিশ্চিতকারী দেশ হিসেবে প্রথম স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর রয়েছে সুইজারল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, হংকং এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতের অবস্থান ২৫তম, যা গত বছরের তুলনায় এক ধাপ উন্নত হয়েছে। অন্যদিকে শ্রীলঙ্কার অবস্থার অবনতি হয়েছে, আর পাকিস্তানের অবস্থানের কিছুটা উন্নতি হয়েছে।
ট্যাক্স জাস্টিস নেটওয়ার্ক ২০০৯ সাল থেকে নিয়মিত এই সূচক প্রকাশ করছে। একটি দেশের আর্থিক ব্যবস্থা কতটা স্বচ্ছ কিংবা কোথায় কোথায় গোপনীয়তার সুযোগ রয়েছে, তা মূল্যায়নের জন্য সংস্থাটি ২০টি সূচকের আওতায় ১০০টিরও বেশি প্রশ্ন বিশ্লেষণ করে।
শূন্য থেকে ১০০ পর্যন্ত একটি মানদণ্ডে প্রতিটি দেশের আইন, নীতিমালা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, করব্যবস্থা এবং আর্থিক তথ্য প্রকাশের কাঠামো যাচাই করা হয়। এরপর নির্ধারণ করা হয় একটি দেশের গোপনীয়তার মান। পাশাপাশি দেশটি বিদেশি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য কতটা আর্থিক সেবা প্রদান করে, সেটিও বিবেচনায় নেওয়া হয়। এই দুই উপাত্ত মিলিয়েই নির্ধারিত হয় চূড়ান্ত অবস্থান।
সূচক অনুযায়ী, কোনো দেশের গোপনীয়তার মান যত বেশি, সেই দেশের আইন ও নীতিমালায় আর্থিক তথ্য গোপন রাখার সুযোগও তত বেশি বলে ধরা হয়।
২০২৬ সালের সূচকে বাংলাদেশের মান দাঁড়িয়েছে ২০৮। গবেষণা সংস্থাটির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে এখনো উল্লেখযোগ্য মাত্রার আর্থিক গোপনীয়তা বিদ্যমান।
বিশেষ করে ট্রাস্ট ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত মালিকানা প্রকাশ, সীমিত দায়বদ্ধ অংশীদারিত্বভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা, কোম্পানির আর্থিক হিসাব প্রকাশ, বিদেশে অর্জিত বিনিয়োগ আয়ের তথ্য, কর পরিপালন এবং স্থাবর সম্পত্তির মালিকানা সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দুর্বলতা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব খাতে পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা না থাকলে অর্থপাচার, কর ফাঁকি কিংবা অবৈধ সম্পদ লুকিয়ে রাখার ঝুঁকি বাড়তে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছেও একটি দেশের আর্থিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তবে পুরো চিত্রটি নেতিবাচক নয়। একই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অর্থপাচারবিরোধী বিধিমালা, সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশ, কর-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা এবং খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদভিত্তিক চুক্তির তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে ভালো।
অর্থাৎ কিছু ক্ষেত্রে দেশের নিয়ন্ত্রক কাঠামো আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও অন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা এখনো রয়ে গেছে।
এ বছর প্রথমবারের মতো স্থাবর সম্পত্তি খাতে অর্থ গোপনের ঝুঁকি মূল্যায়নের জন্য একটি পৃথক সূচকও প্রকাশ করেছে ট্যাক্স জাস্টিস নেটওয়ার্ক।
সেখানে দেখা গেছে, অবৈধ অর্থ স্থাবর সম্পত্তিতে বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় গন্তব্য বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র। গবেষণা সংস্থার মতে, সম্পত্তির প্রকৃত মালিকানা প্রকাশে দুর্বল আইন এবং স্বচ্ছতার ঘাটতির কারণে দেশটি সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।
এই তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে কানাডা এবং পঞ্চম স্থানে রয়েছে মেক্সিকো। অন্যদিকে যুক্তরাজ্য অষ্টম স্থানে অবস্থান করছে। চলতি বছরের শেষ দিকে অবৈধ অর্থ প্রবাহ মোকাবিলায় একটি বৈশ্বিক সম্মেলনের আয়োজন করতে যাচ্ছে দেশটি, যেখানে স্থাবর সম্পত্তির মালিকানায় স্বচ্ছতা অন্যতম আলোচ্য বিষয় হবে।
আর্থিক গোপনীয়তার সূচক কোনো দেশের অর্থনীতি ভালো না খারাপ—তার সরাসরি মূল্যায়ন নয়। বরং এটি দেখায়, একটি দেশের আইন ও প্রশাসনিক কাঠামো কতটা স্বচ্ছ এবং কোথায় কোথায় অর্থ বা সম্পদের প্রকৃত মালিকানা আড়াল করার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের অবস্থান ৫০তম থেকে ৪৭তম হওয়া তাই নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, অর্থপাচার প্রতিরোধ, কর প্রশাসন শক্তিশালী করা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে আস্থা তৈরি করতে হলে কোম্পানির মালিকানা তথ্য প্রকাশ, কর ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং সম্পত্তি নিবন্ধন ব্যবস্থায় আরও কার্যকর সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্ব অর্থনীতি যখন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে ক্রমেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, তখন বাংলাদেশের জন্যও আর্থিক খাতে বিশ্বাসযোগ্যতা আরও শক্তিশালী করা সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি হয়ে উঠেছে।

