শিশুর হাতে খেলনা মানেই আনন্দ, কল্পনা আর শেখার এক ছোট্ট জগৎ। কিন্তু সেই খেলনাই যদি অজান্তে হয়ে ওঠে স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ, তাহলে বিষয়টি শুধু পারিবারিক উদ্বেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি হয়ে যায় জনস্বাস্থ্য ও বাজার নিয়ন্ত্রণের বড় প্রশ্ন। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে শিশুদের খেলনা বাজার অনেকটাই নিয়ন্ত্রণহীনভাবে চলেছে। কোন খেলনায় কী ধরনের রং ব্যবহার হচ্ছে, তাতে বিষাক্ত ধাতু আছে কি না, ছোট অংশ খুলে গিয়ে শিশুর শ্বাসরোধের ঝুঁকি তৈরি করছে কি না—এসব বিষয় সাধারণ ক্রেতা তো দূরের কথা, অনেক বিক্রেতাও জানেন না।
এই বাস্তবতার মধ্যেই সরকার শিশুদের খেলনার নিরাপত্তা ও মান নিশ্চিত করতে নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে। এখন থেকে দেশে শিশুদের খেলনা উৎপাদন, আমদানি ও বাজারজাত করতে হলে নির্ধারিত বাংলাদেশ মান অনুসরণ করতে হবে। অর্থাৎ খেলনা শুধু দেখতে সুন্দর হলেই চলবে না; সেটি শিশুর জন্য নিরাপদ কি না, তা পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে।
নতুন সিদ্ধান্ত কেন গুরুত্বপূর্ণ
শিল্প মন্ত্রণালয় গত ২৩ জুন শিশুদের খেলনাসহ মোট সাতটি পণ্যের জন্য নতুন অথবা সংশোধিত বাংলাদেশ মান বাধ্যতামূলক করেছে। শিশুদের খেলনার পাশাপাশি তালিকায় আছে শিশুদের দুধ খাওয়ানোর প্লাস্টিক বোতল, বিদ্যুৎ-সাশ্রয়ী আলো, ভুট্টার ভোজ্যতেল, নির্মাণে ব্যবহৃত ব্লক, কৃত্রিম তন্তুর শাড়ি এবং নারী ও মেয়েদের পোশাকের কাপড়।
এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো শিশুদের খেলনা। কারণ খেলনা এমন একটি পণ্য, যা শিশু সরাসরি হাতে নেয়, মুখে দেয়, শরীরের সংস্পর্শে রাখে এবং অনেক সময় দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবহার করে। তাই খেলনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়, এটি শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
নির্ধারিত মান কার্যকর করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ মান ও পরীক্ষা প্রতিষ্ঠানকে। প্রতিষ্ঠানটি বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহ, পরীক্ষাগারে পরীক্ষা, মাঠপর্যায়ে তদারকি এবং প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
রঙিন খেলনার আড়ালে লুকানো ঝুঁকি
বাংলাদেশের বাজারে শিশুদের খেলনা সাধারণত রং, নকশা, দাম ও সহজলভ্যতার ভিত্তিতে বিক্রি হয়। কিন্তু একটি খেলনা কতটা নিরাপদ, সেটি অধিকাংশ পরিবার যাচাই করতে পারে না। অনেক সময় কম দামের খেলনা কিনতে গিয়ে অভিভাবকরা বুঝতেই পারেন না, সেই পণ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক বা ভারী ধাতু থাকতে পারে।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুদের জন্য বাজারজাত করা অনেক পণ্যে সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম ও ক্রোমিয়ামের মতো বিষাক্ত উপাদান পাওয়া যায়। এগুলো শিশুর শরীরে প্রবেশ করলে তাৎক্ষণিক প্রভাব সব সময় চোখে না পড়লেও দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের মস্তিষ্ক, স্নায়ু, কিডনি, লিভার এবং হরমোনীয় বিকাশ এসব বিষাক্ত উপাদানের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
শিশুরা স্বাভাবিকভাবেই খেলনা মুখে দেয়। তাদের হাতের পরিচ্ছন্নতা সব সময় নিশ্চিত করা যায় না। ফলে খেলনার রং, ধুলা, ক্ষুদ্র কণা বা রাসায়নিক পদার্থ শরীরে প্রবেশের ঝুঁকি বেশি থাকে। বিশেষ করে যেসব খেলনার রং সহজে উঠে যায় বা যেগুলোর গায়ে তীব্র গন্ধ থাকে, সেগুলো আরও বেশি সন্দেহজনক।
গবেষণার ফলাফল উদ্বেগ বাড়িয়েছে
পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা এবং বিএএন টক্সিকসের যৌথ গবেষণায় ঢাকার বিভিন্ন বাজার থেকে সংগ্রহ করা ১৫০টি শিশুপণ্যের বড় অংশে বিষাক্ত ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া যায়। গবেষণায় বলা হয়, নমুনার প্রায় ৮০ শতাংশে কোনো না কোনোভাবে সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম বা ক্রোমিয়ামের মতো ক্ষতিকর উপাদান শনাক্ত হয়েছে।
গবেষণার একটি উদ্বেগজনক দিক হলো, শিশুদের ব্যবহারের জন্য বিক্রি হওয়া একটি পানির মগে সিসার মাত্রা অত্যন্ত বেশি পাওয়া যায়। যেখানে ইউরোপীয় মানদণ্ড অনুযায়ী নির্দিষ্ট সীমা অনেক কম, সেখানে ওই পণ্যে পাওয়া মাত্রা ছিল তার বহু গুণ বেশি। এ ধরনের তথ্য বাজার নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা এবং ক্রেতা সচেতনতার ঘাটতি—দুই দিকই সামনে আনে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অধিকাংশ অভিভাবক জানেন না যে খেলনায় বিষাক্ত ধাতু থাকতে পারে। অনেকেই নিশ্চিত নন, তারা সন্তানদের জন্য যে খেলনা কিনছেন তা আসলেই নিরাপদ কি না। অর্থাৎ শুধু মান বাধ্যতামূলক করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করাও জরুরি।
মানহীন খেলনায় শিশুর কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে
মানহীন খেলনার ঝুঁকি কয়েকভাবে তৈরি হতে পারে। প্রথমত, খেলনায় ব্যবহৃত রং বা রাসায়নিক পদার্থ শিশুর ত্বকের সংস্পর্শে এসে চুলকানি, অ্যালার্জি বা চর্মরোগের কারণ হতে পারে। দ্বিতীয়ত, শিশু খেলনা মুখে দিলে ক্ষতিকর উপাদান সরাসরি শরীরে যেতে পারে। তৃতীয়ত, খেলনার ছোট অংশ খুলে গেলে তা শ্বাসনালিতে আটকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এ ছাড়া কিছু খেলনা সহজে আগুন ধরতে পারে। আবার কিছু খেলনায় ধারালো প্রান্ত থাকে, যা শিশুকে কেটে বা আঘাত করতে পারে। নিম্নমানের প্লাস্টিক বা রাবারজাত খেলনা অনেক সময় ভেঙে গিয়ে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। এসব কারণে খেলনার নিরাপত্তা শুধু রাসায়নিক পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর গঠন, দাহ্যতা, আকার, উপাদান এবং ব্যবহারযোগ্যতাও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুর শরীর এখনো বিকাশমান থাকে। তাই একই মাত্রার বিষাক্ত উপাদান একজন প্রাপ্তবয়স্কের তুলনায় শিশুর শরীরে বেশি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। শিশুর মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশে ভারী ধাতুর প্রভাব বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষতিকর উপাদানের সংস্পর্শে থাকলে মনোযোগ, শেখার ক্ষমতা, আচরণ এবং শারীরিক বৃদ্ধিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
কী কী পরীক্ষা বাধ্যতামূলক হতে পারে
শিশুদের খেলনার মান নিশ্চিত করতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা করা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এর মধ্যে আছে দাহ্যতা পরীক্ষা, ক্ষতিকর রাসায়নিক পরীক্ষা, ভারী ধাতু পরীক্ষা এবং প্রয়োজন হলে জীবাণুজনিত ঝুঁকি পরীক্ষা।
দাহ্যতা পরীক্ষায় দেখা হবে, খেলনাটি সহজে আগুন ধরে কি না। কারণ শিশুদের খেলনা ঘরের ভেতরে, রান্নাঘরের আশপাশে বা বিদ্যুৎচালিত যন্ত্রের পাশে থাকতে পারে। তাই আগুনের ঝুঁকি কমানো জরুরি।
রাসায়নিক পরীক্ষায় দেখা হবে, খেলনায় এমন কোনো উপাদান আছে কি না, যা আন্তর্জাতিকভাবে শিশুদের জন্য অনিরাপদ হিসেবে বিবেচিত। বিশেষ করে কিছু ধরনের ফথ্যালেট শিশুদের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এগুলো অনেক সময় প্লাস্টিক নরম বা নমনীয় করতে ব্যবহৃত হয়।
ভারী ধাতু পরীক্ষায় সিসা, পারদ, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়ামসহ ক্ষতিকর ধাতুর উপস্থিতি যাচাই করা হবে। খেলনার রং, আবরণ, প্লাস্টিক অংশ অথবা ধাতব অংশে এসব উপাদান থাকতে পারে।
জীবাণুজনিত পরীক্ষা সব খেলনার ক্ষেত্রে প্রয়োজন না হলেও কিছু ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে এমন খেলনা, যা শিশুর মুখের সংস্পর্শে আসে বা পানি ব্যবহার করে খেলা হয়, সেসব পণ্যের ক্ষেত্রে জীবাণুর ঝুঁকিও বিবেচনায় নেওয়া দরকার।
উৎপাদক ও আমদানিকারকদের জন্য সময়সীমা
প্রজ্ঞাপন জারির পর উৎপাদক ও আমদানিকারকদের নির্দিষ্ট সময় দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা বাংলাদেশ মান ও পরীক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রয়োজনীয় অনুমতিপত্র নিতে পারে। এই সময়ের মধ্যে আবেদন না করলে বা মান পরীক্ষায় ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট পণ্য বাজারজাত করা যাবে না।
এটি বাজার ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। আগে অনেক পণ্য আমদানি হয়ে সরাসরি বাজারে চলে আসত। এখন মান যাচাই ছাড়া বাজারে প্রবেশের সুযোগ সীমিত হবে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। কাগজে নিয়ম থাকলেই হবে না; নিয়মটি বাজারে কার্যকর হচ্ছে কি না, সেটি নিয়মিত দেখতে হবে।
বাস্তবায়নের বড় চ্যালেঞ্জ
সরকারের এই উদ্যোগ প্রশংসনীয় হলেও বাস্তবায়ন সহজ হবে না। দেশের খেলনা বাজারের বড় অংশই ছোট আমদানিকারক, পাইকারি বাজার, ফুটপাত, স্থানীয় দোকান এবং অনানুষ্ঠানিক সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। অনেক খেলনার প্যাকেটে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের পরিষ্কার নাম, ঠিকানা বা উপাদানের বিবরণ থাকে না। ফলে এসব পণ্যের উৎস শনাক্ত করাই অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো পরীক্ষাগারের সক্ষমতা। যদি বিপুল পরিমাণ খেলনার নমুনা পরীক্ষা করতে হয়, তাহলে দ্রুত, নির্ভরযোগ্য ও নিয়মিত পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকতে হবে। শুধু রাজধানী নয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বাজারেও নজরদারি প্রয়োজন। কারণ মানহীন পণ্য শহরের বড় দোকান থেকে সরিয়ে দিলেও তা সহজেই ছোট বাজার বা গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এ ছাড়া সীমান্তপথে বা অনানুষ্ঠানিকভাবে আসা নিম্নমানের পণ্য নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হতে পারে। তাই শুধু বাজারে অভিযান চালালেই হবে না; আমদানি পর্যায়, পাইকারি বাজার, গুদাম এবং খুচরা বিক্রির স্তর—সব জায়গায় সমন্বিত নজরদারি দরকার।
শুধু অভিযান নয়, দরকার সচেতনতা
মান নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতন করাও জরুরি। অনেক পরিবার খেলনা কেনার সময় শুধু দাম ও শিশুর পছন্দকে গুরুত্ব দেয়। কিন্তু এখন থেকে পণ্যের গায়ে মানচিহ্ন আছে কি না, উৎপাদনকারী বা আমদানিকারকের তথ্য আছে কি না, খেলনাটি শিশুর বয়সের উপযোগী কি না—এসব বিষয়ও দেখতে হবে।
বিশেষ করে তিন বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য ছোট অংশযুক্ত খেলনা খুব বিপজ্জনক হতে পারে। যেসব খেলনার রং সহজে উঠে যায়, তীব্র রাসায়নিক গন্ধ আছে, অতিরিক্ত সস্তা এবং কোনো উৎসের তথ্য নেই—সেগুলো এড়িয়ে চলা উচিত।
অভিভাবকদের জন্য কয়েকটি সতর্কতা গুরুত্বপূর্ণ। খেলনা কেনার আগে প্যাকেট ভালোভাবে দেখা, শিশুর বয়স অনুযায়ী খেলনা নির্বাচন, ভাঙা বা রং ওঠা খেলনা ফেলে দেওয়া, শিশু খেলনা মুখে দিলে নজর রাখা এবং নিয়মিত খেলনা পরিষ্কার করা—এসব সহজ অভ্যাসও ঝুঁকি কমাতে পারে।
ব্যবসায়ীদের জন্যও এটি সতর্কবার্তা
নতুন নিয়ম ব্যবসায়ীদের জন্যও একটি বার্তা দিচ্ছে। এখন থেকে শুধু কম দামে বেশি পণ্য বিক্রি করাই যথেষ্ট হবে না। নিরাপত্তা, মান ও জবাবদিহি—এই তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। যারা নিয়ম মেনে পণ্য উৎপাদন বা আমদানি করবে, তাদের জন্য বাজারে আস্থা তৈরি হতে পারে। আর যারা নিম্নমানের পণ্য বিক্রি করবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের খেলনা শিল্পের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। যদি স্থানীয় উৎপাদকরা নিরাপদ উপাদান ব্যবহার করে মানসম্মত খেলনা তৈরি করতে পারে, তাহলে দেশীয় বাজারে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। একই সঙ্গে বিদেশে রপ্তানির সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন প্রযুক্তিগত সহায়তা, প্রশিক্ষণ, পরীক্ষা সুবিধা এবং স্পষ্ট নির্দেশিকা।
আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য কেন জরুরি
শিশুদের খেলনার নিরাপত্তা একটি বৈশ্বিক আলোচনার বিষয়। উন্নত দেশগুলোতে খেলনা বাজারে ছাড়ার আগে কঠোর পরীক্ষা করা হয়। কোন রং ব্যবহার করা যাবে, কোন রাসায়নিক সীমার বেশি থাকবে না, কোন বয়সের শিশুর জন্য কোন খেলনা উপযোগী—এসব বিষয়ে বিস্তারিত নিয়ম রয়েছে।
বাংলাদেশের মান নির্ধারণেও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। কারণ খেলনা বাজার এখন আর শুধু স্থানীয় নয়। অনেক পণ্য বিদেশ থেকে আসে, আবার দেশীয় উৎপাদকরাও ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারে যেতে চাইতে পারে। তাই মানদণ্ড এমন হতে হবে, যা বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য, বাস্তবসম্মত এবং শিশুস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় কার্যকর।
বাজার থেকে মানহীন পণ্য সরানো হবে কীভাবে
সরকারি উদ্যোগ সফল করতে হলে প্রথম ধাপে উৎপাদক, আমদানিকারক ও বিক্রেতাদের স্পষ্টভাবে জানাতে হবে—কোন পণ্য মানের আওতায় পড়বে, কীভাবে অনুমতিপত্র নিতে হবে, কী কী পরীক্ষা লাগবে এবং সময়সীমা কত। এরপর বাজারে থাকা অনুমোদনহীন পণ্যের বিষয়ে ধাপে ধাপে ব্যবস্থা নিতে হবে।
প্রথমে সতর্কতা ও সময়সীমা দেওয়া যেতে পারে। এরপরও যদি প্রতিষ্ঠানগুলো মান পরীক্ষায় না আসে বা অনিরাপদ পণ্য বিক্রি চালিয়ে যায়, তাহলে পণ্য জব্দ, জরিমানা এবং বাজারজাত নিষিদ্ধ করার মতো ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে পুরো প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হওয়া জরুরি, যাতে নিয়ম মেনে ব্যবসা করতে চাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো অযথা হয়রানির শিকার না হয়।
ভোক্তার আস্থা ফেরানোই বড় লক্ষ্য
শিশুদের খেলনার বাজারে মান বাধ্যতামূলক করার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত ভোক্তার আস্থা ফিরিয়ে আনা। একজন অভিভাবক যখন সন্তানের জন্য খেলনা কিনবেন, তখন তার মনে অন্তত এই নিশ্চয়তা থাকা উচিত যে পণ্যটি নির্ধারিত নিরাপত্তা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। বর্তমানে সেই নিশ্চয়তা অনেক ক্ষেত্রেই নেই।
তাই সরকার, মান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী, আমদানিকারক, স্থানীয় উৎপাদক এবং ভোক্তা—সব পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শুধু আইন করলেই নিরাপদ বাজার তৈরি হয় না। আইন কার্যকর করতে নিয়মিত নজরদারি, পরীক্ষাগারের সক্ষমতা, জনসচেতনতা এবং কঠোর জবাবদিহি দরকার।
শিশুর খেলনা কোনো সাধারণ পণ্য নয়। এটি শিশুর আনন্দ, শেখা, কল্পনা ও বিকাশের অংশ। তাই সেই খেলনা যদি বিষাক্ত রং, ক্ষতিকর রাসায়নিক বা বিপজ্জনক গঠনের কারণে শিশুর জন্য ঝুঁকি তৈরি করে, তাহলে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত একটি প্রয়োজনীয় ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। তবে এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের দৃঢ়তার ওপর। বাজার থেকে মানহীন পণ্য সরানো, আমদানিতে কঠোরতা আনা, স্থানীয় উৎপাদনে নিরাপদ উপাদান নিশ্চিত করা এবং অভিভাবকদের সচেতন করা—এই চারটি কাজ একসঙ্গে এগিয়ে নিতে পারলে শিশুদের খেলনা বাজারে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
শিশুর হাতে খেলনা থাকবে, কিন্তু সেই খেলনা যেন অদৃশ্য বিষের বাহক না হয়—এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

