বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগের সম্ভাবনা এখনো উজ্জ্বল। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সুশাসন, নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং স্বচ্ছতা জোরদার করতে হবে। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রেসিডেন্ট তানাকা আকিহিকো মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে আগ্রহী জাপানি কোম্পানিগুলো অনিশ্চিত পরিবেশে ব্যবসা সম্প্রসারণে সাধারণত সতর্ক অবস্থান নেয়।
সম্প্রতি ঢাকা সফরকালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তানাকা বলেন, বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে জাপানের আস্থা রয়েছে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও দেশটির বাজার, জনশক্তি এবং ভৌগোলিক অবস্থান জাপানি উদ্যোক্তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিনিয়োগের গতি বাড়াতে হলে এমন একটি পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে নীতিমালার ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে এবং ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনিশ্চয়তা কম থাকবে।
তাঁর মতে, বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় জাপানি বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি বিশ্লেষণে বেশি গুরুত্ব দেন। তারা শুধু সম্ভাব্য মুনাফা নয়, বরং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক নীতি, সামাজিক পরিবেশ, আইনের শাসন এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতাকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেন। এসব সূচকে ইতিবাচক অগ্রগতি হলে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ আরও দ্রুত বাড়তে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশে জাপানের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ ৪০ কোটি ডলারের বেশি। দেশে প্রায় ৩৪০ থেকে ৩৫০টি জাপানি প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন খাতে ব্যবসা পরিচালনা করছে। তবে সম্ভাবনার তুলনায় এই সংখ্যা এখনো সীমিত বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। তাঁদের মতে, উন্নত অবকাঠামো, দক্ষ জনশক্তি এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা গেলে আরও বড় আকারে জাপানি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে আসতে পারে।
ঢাকা সফরে তানাকা সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে জাপানের সহায়তায় বাস্তবায়নাধীন বিভিন্ন মেগা প্রকল্প দ্রুত শেষ করার বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত হয়েছে। আলোচনায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল, ঢাকার বিভিন্ন মেট্রোরেল লাইন, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, বন্দরসংযুক্ত সড়ক ও যোগাযোগ অবকাঠামোসহ বেশ কয়েকটি কৌশলগত প্রকল্প গুরুত্ব পায়।
তাঁর ভাষ্য, এসব প্রকল্প শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, বরং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তিও শক্তিশালী করবে। বিশেষ করে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, আধুনিক বন্দর এবং নির্ভরযোগ্য পরিবহন নেটওয়ার্ক বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বড় ভূমিকা রাখবে।
সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি বড় প্রকল্পের অগ্রগতি প্রত্যাশার তুলনায় ধীর হওয়ার বিষয়েও কথা বলেন জাইকা প্রধান। তিনি জানান, প্রশাসনিক জটিলতা, দরপত্র ও ক্রয়প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে কিছু প্রকল্পে সময় লেগেছে। বিশেষ করে এমআরটি লাইন-১ ও এমআরটি লাইন-৫-এর বাস্তবায়ন পরিকল্পনার তুলনায় ধীরগতিতে এগোচ্ছে।
তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার ও জাইকার মধ্যে কোনো মৌলিক মতবিরোধ নেই। উভয় পক্ষই প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে আগ্রহী। তাঁর মতে, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে নানা ধরনের যাচাই-বাছাইয়ের কারণে সময় লাগা অস্বাভাবিক নয়। তবে ভবিষ্যতে ক্রয় ও দরপত্র প্রক্রিয়া আরও দ্রুত সম্পন্ন হলে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়বে।
জাপানের অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোর ব্যয় তুলনামূলক বেশি—এমন সমালোচনারও জবাব দেন তানাকা। তাঁর মতে, শুধু প্রকল্পের ব্যয় দেখে মূল্যায়ন করলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। প্রকল্পের নির্মাণমান, স্থায়িত্ব, নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুবিধাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, উন্নত মানের অবকাঠামো নির্মাণে প্রাথমিক ব্যয় কিছুটা বেশি হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে তা দেশের অর্থনীতিকে বহুমুখী সুবিধা দেয়। উদাহরণ হিসেবে তিনি ঢাকার মেট্রোরেলের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, এই প্রকল্প নগরবাসীর যাতায়াতে ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে এবং উন্নত অবকাঠামোয় বিনিয়োগের সুফল স্পষ্ট করেছে।
আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের গুরুত্ব বাড়ছে বলে মনে করেন জাইকা প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশকে বিবেচনা করছে জাপান। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে যোগাযোগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ কমাতে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, আধুনিক গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হলে বড় জাহাজ সরাসরি বাংলাদেশে ভিড়তে পারবে, যা আমদানি-রপ্তানি ব্যয় কমানোর পাশাপাশি আঞ্চলিক বাণিজ্যেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে।
তিনি আরও জানান, একসময় জাপান বাংলাদেশ, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে যুক্ত করে একটি বিস্তৃত আঞ্চলিক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছিল। একইভাবে নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশকে সংযুক্ত করে উত্তর-দক্ষিণ অর্থনৈতিক করিডর তৈরির উদ্যোগও ছিল। তবে মিয়ানমারের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এসব পরিকল্পনার বাস্তবায়ন অনেকটাই স্থবির হয়ে রয়েছে।
জাইকার ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি প্রসঙ্গে তানাকা বলেন, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি, আন্তর্জাতিক সুদের হার এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে ঋণের শর্ত কিছুটা সমন্বয় করতে হয়েছে। তবে শুধু সুদের হার নয়, ঋণ পরিশোধের দীর্ঘ সময়সীমা এবং গ্রেস পিরিয়ডও বিবেচনায় নেওয়া উচিত। তাঁর মতে, দীর্ঘমেয়াদি পরিশোধ সুবিধার কারণে এসব ঋণ এখনো তুলনামূলক সহজ শর্তের অর্থায়ন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
তিনি ব্যক্তিগতভাবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আরও সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার পক্ষে মত দিলেও জাইকার আর্থিক সক্ষমতা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করে তানাকা বলেন, কোভিড-১৯ মহামারি, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি এবং বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক সংকট দেশের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করলেও দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা অটুট রয়েছে। তবে উচ্চ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সামষ্টিক অর্থনীতির ভিত্তি আরও শক্তিশালী করা, কর আদায় বাড়ানো, সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ অব্যাহত রাখা জরুরি।
তাঁর মতে, শুধু তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরশীল থাকলে ভবিষ্যতের প্রবৃদ্ধি সীমিত হতে পারে। তাই শিল্প খাতের বহুমুখীকরণ, নতুন রপ্তানি পণ্য তৈরি এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খলের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
সবশেষে তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও জাপানের সম্পর্ক কেবল উন্নয়ন সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে পরিণত হচ্ছে। সুশাসন, স্থিতিশীলতা ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে আগামী বছরগুলোতে দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও জাপানি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

