দীর্ঘ ১৩ বছরেও খুলনার শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্প শেষ না হওয়ায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। প্রকল্প এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শনের সময় কাজের ধীরগতি, নকশাগত অসংগতি এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার ত্রুটি দেখে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কঠোর জবাবদিহির মুখোমুখি করেন। বিশেষ করে প্রকল্প পরিচালকের ব্যাখ্যায় অসন্তুষ্ট হয়ে তিনি তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
শনিবার তদন্ত কমিটির সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। এ সময় স্থানীয় বাসিন্দারাও দীর্ঘদিন ধরে চলমান নির্মাণকাজের কারণে তাঁদের ভোগান্তি, যান চলাচলের সমস্যা এবং জলাবদ্ধতার বিষয় তুলে ধরেন। এসব অভিযোগ শোনার পাশাপাশি সচিব প্রকল্পের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন এবং বাস্তব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন।
পরিদর্শনের সময় সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন ওঠে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার নকশা নিয়ে। দেখা যায়, একদিকে পানি নিয়ন্ত্রণের জন্য স্লুইসগেট নির্মাণ করা হয়েছে, অন্যদিকে তার সামনেই বাঁধ থাকায় পানি চলাচলের পথ কার্যত বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালকের ব্যাখ্যা শুনে নাসিমুল গনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, পানি বের হওয়ার ব্যবস্থা করে আবার সেটি বন্ধ করে দেওয়ার যৌক্তিকতা কোথায়। এমন পরিকল্পনা কীভাবে অনুমোদন পেল, সেটিও জানতে চান তিনি।
পরিদর্শনের সময় তিনি প্রকল্পের নির্মাণমান, নকশা বাস্তবায়ন এবং কাজের অগ্রগতি নিয়েও একাধিক নির্দেশনা দেন। একই সঙ্গে প্রকল্পটি দ্রুত শেষ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পটি ২০১৩ সালের ৭ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সভায় অনুমোদন পায়। শুরুতে প্রকল্পটির ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৯৮ কোটি টাকা। পরে ২০২০ সালে দ্বিতীয় দফায় প্রকল্প সংশোধন করে ব্যয় বাড়িয়ে ২৫৯ কোটি টাকা করা হয়। সে সময় দ্রুত কাজ শেষ করার শর্তে সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হলেও বাস্তব অগ্রগতি প্রত্যাশিত ছিল না।
সম্প্রতি তৃতীয় দফায় প্রকল্পটির ব্যয় আরও বাড়িয়ে ২৮০ কোটি টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। তবে দীর্ঘ সময় ধরে প্রকল্পটি শেষ না হওয়ায় সর্বশেষ একনেক সভায় বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে বিলম্বের কারণ খুঁজে বের করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং ব্যয় বৃদ্ধির সংশোধিত প্রস্তাব পুনর্বিবেচনার জন্য ফেরত পাঠানো হয়।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর প্রকল্পের অনিয়ম, বিলম্ব এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি খতিয়ে দেখতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম এবং বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের সচিব সিরাজুন নূর চৌধুরী সদস্য হিসেবে রয়েছেন।
পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানান, প্রকল্পের কাজ কেন নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি, বর্তমানে এর অগ্রগতি কতটুকু এবং নির্মাণমান কেমন—এসব বিষয় সরেজমিনে যাচাই করা হয়েছে। তদন্তের তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা হবে এবং প্রকল্পটি দ্রুত শেষ করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
অবকাঠামো খাতের বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে দীর্ঘসূত্রতা, ব্যয় বৃদ্ধি এবং বারবার সংশোধনের প্রবণতা উন্নয়ন কার্যক্রমের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। একটি প্রকল্প বছরের পর বছর ঝুলে থাকলে শুধু সরকারি ব্যয়ই বাড়ে না, সাধারণ মানুষও দীর্ঘদিন ভোগান্তির শিকার হন। তাই প্রকল্প পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন, তদারকি এবং জবাবদিহি আরও শক্তিশালী করা সময়ের দাবি। তাঁদের মতে, চলমান তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া গেলে ভবিষ্যতে একই ধরনের দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

