মৌসুমের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের মুখে মঙ্গলবার (৭ জুলাই) কার্যত অচল হয়ে পড়ে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। টানা ভারি বর্ষণে নগরের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। সড়ক, আবাসিক এলাকা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো জলাবদ্ধতায় আক্রান্ত হওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েন সাধারণ মানুষ। একই সঙ্গে বৈরি আবহাওয়ার কারণে বিমান চলাচলেও বিঘ্ন ঘটে, ফলে সার্বিকভাবে নগরজীবনে নেমে আসে অচলাবস্থা।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ৩৮৬ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এটি চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত। অল্প সময়ের মধ্যে এত বিপুল পরিমাণ বৃষ্টির কারণে নগরের বিদ্যমান পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা চাপ সামাল দিতে পারেনি। ফলে বিভিন্ন সড়ক, অলিগলি ও নিচু এলাকায় দ্রুত পানি জমে যায়।
প্রবল বৃষ্টির প্রভাব পড়ে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে অন্তত তিনটি উড়োজাহাজ চট্টগ্রামে অবতরণ করতে না পেরে ঢাকায় ফিরে যায়। এছাড়া বেশ কয়েকটি ফ্লাইট নির্ধারিত সময়ের তুলনায় প্রায় ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা বিলম্বে চলাচল করে, যা যাত্রীদের ভোগান্তি আরও বাড়িয়ে দেয়।
সকালের পর থেকেই নগরের বহু এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে যায়। অনেক বাসাবাড়ি ও দোকানপাটের নিচতলায় পানি ঢুকে পড়ে। গণপরিবহন চলাচল ব্যাহত হওয়ায় কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছে। পরিস্থিতির কারণে কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলমান অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত করা হয় এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ছুটি ঘোষণা করা হয়।
ভারি বর্ষণের পাশাপাশি ঝড়ো বাতাসও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। নগরের বিভিন্ন এলাকায় গাছ উপড়ে পড়ে সাময়িকভাবে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পতেঙ্গা এলাকায় প্রবল পানির স্রোতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের অংশ ভেঙে যায়। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ফ্লাইওভার নির্মাণকাজের জন্য তৈরি করা ওই বাইপাস সড়কটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, টানা বর্ষণের কারণে পাহাড়ধসের আশঙ্কাও বেড়েছে। ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, চট্টগ্রাম মহানগরীতে এখন পর্যন্ত পাহাড়ধসের কোনো ঘটনা না ঘটলেও সম্ভাব্য যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাদের ইউনিটগুলো সর্বোচ্চ প্রস্তুত রয়েছে। তবে পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটির কাপ্তাই এলাকায় একটি করে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে।
সবচেয়ে বেশি জলাবদ্ধতা দেখা যায় আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা, কাতালগঞ্জ, কাপাসগোলা, ফরিদারপাড়া, চান্দগাঁও, চকবাজারের তেলেপট্টি গলি, কাট্টলীর ঈশান মহাজনহাট সড়ক, হালিশহরের কে ও এল ব্লক, সোনালি, বসুন্ধরা, রামপুর ও আনন্দীপুর আবাসিক এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে। কোথাও কোথাও পানি কোমরসমান হওয়ায় মানুষের স্বাভাবিক চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে মঙ্গলবার সকালে বিভিন্ন জলাবদ্ধ এলাকা পরিদর্শন করেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেন। তিনি পানি দ্রুত অপসারণ এবং চলমান খাল সংস্কার ও পরিষ্কার কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ দেন। মেয়রের ভাষ্য অনুযায়ী, হিজড়া খাল, জামাল খান খাল, আজব বাহার খাল ও গুলজার খালে উন্নয়নকাজ চলছে। সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড এবং সিটি করপোরেশন যৌথভাবে কাজ করছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, বৃষ্টি থেমে গেলে নিচু এলাকাগুলোর পানি এক থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যেই নেমে যাবে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপটি স্থলভাগে উঠে ভারতের দিকে সরে গেলেও এর প্রভাবে আরও দুই থেকে তিন দিন বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। যদিও বুধবার থেকে ভারি বর্ষণের প্রবণতা কিছুটা কমতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ সময় পর্যন্ত নদী ও সমুদ্রবন্দরগুলোতে বিদ্যমান সতর্ক সংকেত বহাল থাকবে।
চট্টগ্রামের এই পরিস্থিতি আবারও মনে করিয়ে দিল, জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে স্বল্প সময়ে অতিভারি বৃষ্টিপাত এখন আর ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু সেই বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নগরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। খাল পুনরুদ্ধার, ড্রেনেজ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়ন না হলে ভবিষ্যতেও এমন রেকর্ড বৃষ্টিতে চট্টগ্রামের জনজীবন একইভাবে বিপর্যস্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।

