বাংলাদেশ সফররত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) প্রতিনিধিদল সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো, ব্যাংক খাতের সংস্কার এবং খেলাপি ঋণ কমানোর অগ্রগতি নিয়ে সরকারের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেছে। অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো আগামী ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
গতকাল রোববার অর্থ মন্ত্রণালয়ে দিনব্যাপী বৈঠকে অর্থসচিব খায়রুজ্জামান মজুমদারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আইএমএফ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বিভিন্ন অর্থনৈতিক বিষয়ে মতবিনিময় করেন। বৈঠকে সরকার নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের রূপরেখা তুলে ধরে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, আইএমএফের মূল আগ্রহ ছিল নতুন বেতন কাঠামো কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, তা জানা। এ বিষয়ে সংস্থাটি কোনো আপত্তি জানায়নি।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে আইএমএফ ব্যাংকিং খাতের সংস্কার কার্যক্রম, খেলাপি ঋণ কমানোর উদ্যোগ এবং ব্যাংক রেজুলেশন কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে। একই সঙ্গে এসব সংস্কার কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে, সে বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে।
এদিন অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আইএমএফের নির্ধারিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি। সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকারের জানাজায় অংশ নিতে তিনি দপ্তর ত্যাগ করায় বৈঠকটি আজ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
আলোচনায় আইএমএফ চলতি অর্থবছরের সরকারি পরিকল্পনার পাশাপাশি নতুন বেতন কাঠামোর বিস্তারিত জানতে চায়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, বেতন কাঠামো কত ধাপে বাস্তবায়ন হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে মন্ত্রিসভা। এ জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ চলতি বাজেটেই সংরক্ষণ করা হয়েছে।
বর্তমানে আইএমএফ প্রায় ৪৫০ কোটি ডলারের সম্ভাব্য নতুন ঋণ কর্মসূচির বাস্তবতা যাচাই করছে। ১৬ জুলাই পর্যন্ত চলা এই সফরে সংস্থাটি সরকারের সংস্কার কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও মূল্যায়ন করবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, ২০১৫ সালে সর্বশেষ সরকারি বেতন কাঠামো কার্যকর হয়েছিল। এরপর মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেলেও বেতন-ভাতা সেই হারে সমন্বয় হয়নি। এ কারণেই নতুন বেতন কাঠামো চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, কত ধাপে এটি বাস্তবায়ন হবে, তার ওপরই বাজেট থেকে প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণ নির্ভর করবে।
এদিকে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে সচিব পর্যায়ের একটি কমিটি ইতোমধ্যে প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করেছে। আরও এক বা দুটি বৈঠকের পর এটি অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভার কাছে পাঠানো হবে।
রোববার এক পৃথক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, জনগণের স্বার্থ ও দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হলেই কেবল বাংলাদেশ নতুন আইএমএফ কর্মসূচিতে অংশ নেবে। তার ভাষায়, সরকারের কাছে অর্থ সংগ্রহের চেয়ে দেশের স্বার্থ রক্ষা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়—এমন কোনো কর্মসূচিতে বর্তমান সরকার যুক্ত হবে না।
তিনি দাবি করেন, আগের সরকারের সময়ে নেওয়া আইএমএফ কর্মসূচির কিছু শর্ত জনস্বার্থের পরিপন্থী ছিল এবং গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের জন্য গ্রহণযোগ্য ছিল না। তাই বর্তমান সরকার সেই কর্মসূচি থেকে সরে এসেছে।
ডিসেম্বরেই আসছে খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনার নতুন কাঠামো:
বাংলাদেশ ব্যাংক আইএমএফকে জানিয়েছে, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে খেলাপি ঋণ নিষ্পত্তির জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামো চালু করা হবে। প্রস্তাবিত নীতিমালা অনুযায়ী, যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশের বেশি, তাদেরকে নির্দিষ্ট সময়সূচি, লক্ষ্য এবং কর্মপরিকল্পনাসহ খেলাপি ঋণ কমানোর রোডম্যাপ প্রস্তুত করতে হবে। এসব পরিকল্পনা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন সাপেক্ষে বাস্তবায়ন করা হবে।
বাংলাদেশ সফররত আইএমএফ মিশনের প্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরে। একই বৈঠকে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান (আইএফআরএস) বাস্তবায়নের অগ্রগতি সম্পর্কেও জানতে চায় আইএমএফ। বাংলাদেশ ব্যাংক এ বিষয়ে সর্বশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরে।
এ ছাড়া আইনগত সংস্কার, সংকটাপন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা, খেলাপি ঋণ নিষ্পত্তি কাঠামো, দেউলিয়াত্ব আইন, আদালতের বাইরে ঋণ পুনর্গঠন এবং নতুন প্রণোদনা কর্মসূচির উদ্দেশ্য, অর্থায়ন ও শর্তাবলি নিয়েও আলোচনা হয়।
মুদ্রানীতি বিভাগ এবং বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ ও ট্রেজারি ব্যবস্থাপনা বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠক করে আইএমএফ। সেখানে বৈদেশিক মুদ্রার স্পট মার্কেটে বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক রেজুলেশন বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে ব্যাংক একীভূতকরণ কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আইএমএফ প্রতিনিধিদল।
বিশেষ করে পাঁচটি দুর্বল ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সর্বশেষ অবস্থা জানতে চায় সংস্থাটি। আমানতকারীরা স্বাভাবিকভাবে টাকা তুলতে পারছেন কি না, সে বিষয়েও জানতে চাওয়া হয়। জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা ব্যাংক রেজুলেশন কার্যক্রম ও একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার সর্বশেষ অগ্রগতি তুলে ধরেন।
তারা আরও জানান, ব্যাংক রেজুলেশন আইন, ২০২৬-এর ১৮(ক) ধারা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ওই ধারাটি বহাল থাকলে একীভূত হওয়ার পরও দুর্বল ব্যাংকের সাবেক মালিকদের পুনরায় নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার সুযোগ থাকত।

