ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের বাকি কাজ সম্পন্ন করতে বাংলাদেশকে বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তা দেবে ডেনমার্ক। প্রায় সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার এই সহায়তার মধ্যে দেড় হাজার কোটি টাকা দেওয়া হবে অনুদান হিসেবে, আর বাকি তিন হাজার কোটি টাকা দেওয়া হবে দেড় থেকে দুই শতাংশ সুদে সহজ শর্তের ঋণ হিসেবে।
গতকাল মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূতের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীও উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান প্রতিমন্ত্রী নিজে। তিনি জানান, ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে এই বৈঠকে মূলত ঢাকা ওয়াসার পানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
তিনি জানান, ঢাকা শহরে প্রতিদিন পানির চাহিদা প্রায় তিন কোটি পঁচিশ লাখ লিটার। অথচ ঢাকা ওয়াসা ভূগর্ভস্থ ও উপরিভাগের উৎস মিলিয়ে সরবরাহ করতে পারে প্রায় দুই কোটি পঁচানব্বই লাখ থেকে তিন কোটি পাঁচ লাখ লিটার পানি। ফলে প্রতিদিনই একটি ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
এই ঘাটতি পূরণে মেঘনা নদী থেকে পানি এনে সরবরাহের একটি বড় উদ্যোগ ইতিমধ্যে নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, একটি সংশ্লিষ্ট প্রকল্প পুরোপুরি চালু হলে প্রতিদিন প্রায় পঞ্চাশ কোটি লিটার পানি ঢাকায় সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
সায়েদাবাদ প্রকল্প সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত জানান, মেঘনা নদী থেকে পানি এনে একটি ট্রিটমেন্ট প্লান্টের মাধ্যমে তা শোধন করে ঢাকা শহরে সরবরাহ করা হবে এই প্রকল্পের আওতায়। এই প্রকল্প থেকে প্রতিদিন প্রায় পঁচানব্বই কোটি লিটার পানি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, সায়েদাবাদ প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ষোলো হাজার কোটি টাকা। দুই হাজার পনেরো সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের কাজ মূলত দুই হাজার ত্রিশ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারিত ছিল। তবে সরকার এখন চাইছে নির্ধারিত সময়ের আগেই, অর্থাৎ দুই হাজার ঊনত্রিশ সালের মধ্যে এই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করতে।
তিনি জানান, প্রকল্পের প্রায় এগারো থেকে বারো হাজার কোটি টাকার কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়ে গেছে। বাকি শেষ ধাপের কাজ সম্পন্ন করতেই এই সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার সহায়তা দিচ্ছে ডেনমার্ক সরকার, যার মধ্যে দেড় হাজার কোটি টাকা সরাসরি অনুদান এবং প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা সহজ শর্তের ঋণ হিসেবে দেওয়া হবে। এই ঋণের সুদের হার হবে দেড় থেকে দুই শতাংশের মধ্যে, যা কুড়ি বছর মেয়াদে পরিশোধ করার সুযোগ থাকবে।
এর পাশাপাশি রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে পানি শোধন ও সরবরাহ কার্যক্রমেও ডেনমার্ক প্রায় একশ কোটি টাকা সহায়তা দিচ্ছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
বৈঠকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে ডেনমার্ক। একইসঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও দেশটির সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সম্ভাব্যতা যাচাই করে পরবর্তীতে সহযোগিতার সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্র নির্ধারণ করা হবে বলে জানিয়েছে ডেনমার্ক পক্ষ।
ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে একটি নতুন উদ্যোগের কথাও জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, বর্তমানে ঢাকা ওয়াসার সরবরাহ করা পানির প্রায় চুয়াত্তর শতাংশ আসে ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে, বাকি চব্বিশ শতাংশ আসে উপরিভাগের পানি থেকে। অথচ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী কোনো শহরে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার ত্রিশ শতাংশের মধ্যে রাখার কথা বলা হয়ে থাকে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এভাবে ক্রমাগত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন চলতে থাকলে জলবায়ু পরিবর্তনসহ সামগ্রিক পরিবেশের ওপর এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
এই সংকট মোকাবিলায় লবণাক্ত পানি শোধন করে ব্যবহারের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। এই লক্ষ্যে চাঁদপুর ও মোংলা— সমুদ্র উপকূলের কাছাকাছি অবস্থিত এই দুটি স্থানে বড় আকারের প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে।
তিনি জানান, এই প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়নে সহযোগিতা করবে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ। তার ভাষায়, লবণাক্ত পানি শোধন করে প্রাপ্ত সুপেয় পানি ভবিষ্যতে গ্যাস বা বিদ্যুতের জাতীয় গ্রিডের মতোই পাইপলাইনের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় পৌঁছে দেওয়ার একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। গ্যাস যদি সারা দেশে সরবরাহ করা সম্ভব হয়, তাহলে একইভাবে পানিও সারা দেশে পৌঁছে দেওয়া অসম্ভব কিছু নয় বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

