দেশের একমাত্র চলমান মেট্রোরেল এমআরটি লাইন-৬–এ একাধিক কাঠামোগত ও পরিচালনগত ত্রুটি শনাক্ত করেছে স্বাধীন নিরাপত্তা অডিট কমিটি। সর্বশেষ নিরাপত্তা নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিদর্শনে ৭৩০টি বেয়ারিং প্যাড ত্রুটিপূর্ণ পাওয়া গেছে, যা পরীক্ষা করা মোট প্যাডের ২৩ শতাংশেরও বেশি।
একই সঙ্গে পিয়ারে ফাটল, রেললাইনে মরিচা, বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ এবং একাধিক পরিচালনগত দুর্বলতার কারণে যাত্রী নিরাপত্তা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কমিটি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ত্রুটিপূর্ণ বেয়ারিং প্যাডের কারণে ট্রেন চলাচলে অতিরিক্ত কম্পন ও ঝাঁকুনি সৃষ্টি হচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে যাত্রীস্বাচ্ছন্দ্য ও ট্রেনের গতিতে। নকশা অনুযায়ী ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার গতিতে চলার সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে ট্রেনগুলো ৬০ থেকে ৯০ কিলোমিটার গতিতে চলাচল করছে। কিছু অংশে গতি কমে ঘণ্টায় মাত্র ৪৪ থেকে ৪৭ কিলোমিটারে নেমে এসেছে।
নিরাপত্তা অডিটে লাইনের বিভিন্ন স্থানে পিয়ার হেড, কংক্রিটের বেইজ ও বক্স গার্ডারে উল্লেখযোগ্য ফাটলও শনাক্ত হয়েছে। বিশেষ করে ৩৪১ নম্বর পিয়ারে এক মিলিমিটারের বেশি প্রশস্ত ফাটলকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে দ্রুত সংস্কারের সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ট্রেনে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী ওভারহেড ক্যাটেনারি সিস্টেমের বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি হচ্ছে, যা অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি ট্রান্সফরমারের ত্রুটি, সিগন্যালিং কক্ষে পানি চুইয়ে পড়া এবং বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার দুর্বলতাও বড় ধরনের ঝুঁকি হিসেবে উঠে এসেছে।
অডিট কমিটির পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ৪২৩, ৪৪২, ৪৪৬ ও ৪৪৮ নম্বর পিয়ারের বেয়ারিং প্যাডে গুরুতর সমস্যা রয়েছে। কয়েকটি স্থানে প্যাড স্থানচ্যুত হয়েছে এবং ট্রেন চলাচলের সময় সেগুলোতে অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এসব প্যাড দ্রুত প্রতিস্থাপন বা মেরামতের সুপারিশ করা হয়েছে।
নিরাপত্তা প্রতিবেদনে ট্রেন পরিচালনার ক্ষেত্রেও একাধিক দুর্বলতা তুলে ধরা হয়েছে। ঘন ঘন ব্রেকিংয়ের কারণে ট্রেন নির্ধারিত অবস্থানের আগেই থেমে যাচ্ছে। এতে ট্রেনের দরজা ও প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোরের মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি হচ্ছে, যা যাত্রীদের জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।
এ ছাড়া ট্রেনের চাকার ক্ষয়, সম্ভাব্য ফাটল, দরজা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ত্রুটি এবং প্যান্টোগ্রাফের ক্ষয়ও শনাক্ত হয়েছে। এসব সমস্যা সমাধান না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছে কমিটি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বারবার ত্রুটির কারণে ইতোমধ্যে পাঁচটি ট্রেনসেট সাময়িকভাবে পরিচালনা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। পাশাপাশি ১০টি স্থানে গতিসীমা কমিয়ে পরিচালনা করা হচ্ছে।
অডিটে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও তুলে ধরা হয়েছে। প্রয়োজনীয় পরিদর্শন যন্ত্রপাতি, খুচরা যন্ত্রাংশ এবং রিয়েল-টাইম স্ট্রাকচারাল মনিটরিং ব্যবস্থার অভাবের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই সমস্যা দেখা দেওয়ার পর ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে।
চুয়েটের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক মো. জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বে গঠিত ৯ সদস্যের নিরাপত্তা অডিট কমিটি জানিয়েছে, এমআরটি লাইন-৬ বর্তমানে একটি ‘যৌগিক ঝুঁকি’ পরিবেশে পরিচালিত হচ্ছে। এসব ত্রুটি দ্রুত সমাধান না করলে যাত্রী নিরাপত্তা ও অবকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে।
বুয়েটের অধ্যাপক ড. শামসুল হক বলেন, এত অল্প সময়ের মধ্যে বেয়ারিং প্যাড সরে যাওয়া বা নিচে পড়ে যাওয়ার ঘটনা স্বাভাবিক নয়। বর্তমানে ব্র্যাকেট বসিয়ে সাময়িকভাবে সমস্যাগুলো নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে, তবে এটি স্থায়ী সমাধান নয়।
কমিটি জরুরি ভিত্তিতে ত্রুটিপূর্ণ বেয়ারিং প্যাড প্রতিস্থাপন, কাঠামোগত ফাটল মেরামত, রিয়েল-টাইম মনিটরিং ব্যবস্থা চালু, পূর্ণাঙ্গ ডায়নামিক পরীক্ষা এবং আন্তর্জাতিক মানের স্বাধীন নিরাপত্তা পর্যালোচনার সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং নিয়মিত নিরাপত্তা অডিট পরিচালনার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের অক্টোবরে ফার্মগেট এলাকায় একটি বেয়ারিং প্যাড নিচে পড়ে একজন পথচারীর মৃত্যুর ঘটনার পর উচ্চ আদালত ও সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় এই স্বাধীন নিরাপত্তা অডিট পরিচালনা করা হয়।

