বাণিজ্য সংগঠনগুলোর নির্বাচন পদ্ধতি, সদস্য ফি এবং পরিচালনা কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন সংশোধনীতে নির্বাহী কমিটি বা পরিচালনা পর্ষদের সব পদে সরাসরি ভোটের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন (এফবিসিসিআই)-এর পরিচালনা পর্ষদের সদস্যসংখ্যা ৪৬ থেকে বাড়িয়ে ৪৮ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত করা বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা-২০২৫ সংশোধনের খসড়ায় এসব প্রস্তাব রাখা হয়েছে। গত সপ্তাহে মতামত গ্রহণের জন্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে খসড়াটি প্রকাশ করা হয়। আগামী ২৫ জুলাই পর্যন্ত অংশীজনদের মতামত নেওয়া হবে।
সব পদে সরাসরি ভোটের বাধ্যবাধকতা থাকছে না:
বর্তমান বিধিমালা অনুযায়ী বাণিজ্য সংগঠনের সভাপতি, সহসভাপতিসহ নির্বাহী কমিটির সব পদে সরাসরি ভোটের বিধান রয়েছে। তবে নতুন সংশোধনীতে এ নিয়ম শিথিল করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। খসড়ায় বলা হয়েছে, কোনো বাণিজ্য সংগঠনের নির্বাচন, ভোটাধিকার ও নেতৃত্ব নির্বাচন হবে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের সংঘবিধি ও সংঘস্মারক অনুযায়ী। অর্থাৎ সংগঠনগুলো নিজেদের গঠনতন্ত্রের ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্বাচনের পদ্ধতি নির্ধারণ করতে পারবে।
এ ছাড়া বাণিজ্য সংগঠনের সংঘবিধি ও সংঘস্মারক সংশোধনের প্রক্রিয়াও সহজ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। খসড়া অনুযায়ী, বার্ষিক সাধারণ সভা বা বিশেষ সাধারণ সভায় নির্ধারিত সংখ্যক সদস্যের উপস্থিতি এবং উপস্থিত সদস্যদের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশের সম্মতিতে এসব সংশোধনী অনুমোদন করা যাবে। যদি কোনো সংগঠনের সংঘবিধিতে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট নিয়ম না থাকে, তাহলে বৈধ এক-তৃতীয়াংশ সদস্যের উপস্থিতি এবং তাঁদের দুই-তৃতীয়াংশের সম্মতি প্রয়োজন হবে।
একাধিক সদস্য পদ থাকলেও ভোট হবে একটি:
নতুন বিধিমালায় ভোট ব্যবস্থায়ও পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। কোনো ব্যবসায়ীর একটি সংগঠনে একাধিক সদস্যপদ থাকলেও তিনি নির্বাচনে একটির বেশি ভোট দিতে পারবেন না। বর্তমান নিয়মে কোনো ব্যবসায়ীর একাধিক সদস্যপদ থাকলে প্রতিটি সদস্যপদের বিপরীতে আলাদা ভোট দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সদস্য ফি নির্ধারণের ক্ষমতা ফিরে পেতে পারে সংগঠন:
খসড়ায় বাণিজ্য সংগঠনগুলোর ভর্তি ফি ও বার্ষিক চাঁদা নির্ধারণের ক্ষমতা আবার সংশ্লিষ্ট সংগঠনের হাতে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। গত বছর সংশোধিত বিধিমালায় সরকারিভাবে চাঁদার হার নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে নির্ধারিত ফি বেশি হওয়ায় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিটি সংগঠন নিজেদের সংঘস্মারক ও সংঘবিধি অনুসারে সদস্য ফি ও বার্ষিক চাঁদার পরিমাণ নির্ধারণ করতে পারবে।
এফবিসিসিআইয়ের পর্ষদে বাড়ছে দুই সহসভাপতির পদ:
দীর্ঘ ২১ মাস ধরে এফবিসিসিআইয়ে কোনো নির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদ নেই। সর্বশেষ পর্ষদ ছিল ৮০ সদস্যের। গত বছরের বিধিমালায় সেই সংখ্যা কমিয়ে ৪৬ করা হয়েছিল। নতুন সংশোধনীতে আবারও পর্ষদের আকার বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে সভাপতি, সিনিয়র সহসভাপতি ও চার সহসভাপতি ছাড়াও ৪২ জন পরিচালক রাখার কথা বলা হয়েছে। ফলে মোট সদস্যসংখ্যা দাঁড়াবে ৪৮ জনে।
খসড়া অনুযায়ী, ৪২ জন পরিচালকের মধ্যে ৩০ জন চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশন গ্রুপ থেকে নির্বাচিত হবেন। এছাড়া চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশন গ্রুপ থেকে পাঁচজন করে মোট ১০ জন মনোনীত পরিচালক থাকবেন।
এর বাইরে নারী চেম্বার ও নারী অ্যাসোসিয়েশন গ্রুপ থেকে একজন করে আরও দুজন মনোনীত পরিচালক যুক্ত হবেন। এই ১২ জন মনোনীত পরিচালকের জন্য নির্বাচিত পর্ষদ ২২ জনের নাম সরকারের কাছে পাঠাবে। এরপর সরকার চূড়ান্ত মনোনয়ন দেবে।
বর্তমানে যৌথ চেম্বারে প্রতি পাঁচজন বাংলাদেশি ব্যবসায়ীর বিপরীতে অন্তত দুজন বিদেশি ব্যবসায়ী থাকার বিধান রয়েছে। নতুন খসড়ায় এই শর্ত পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, যৌথ চেম্বারে সংশ্লিষ্ট দেশের অন্তত দুজন ব্যবসায়ী থাকলেই হবে। কারা সদস্য হবেন, তা সংশ্লিষ্ট চেম্বারের সংঘবিধি অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।
এফবিসিসিআইয়ের সাধারণ পরিষদের সদস্যদের দুই বছরের মেয়াদের জন্য এককালীন নিবন্ধন ফি কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে এই ফি ২০ হাজার টাকা হলেও খসড়ায় তা কমিয়ে ১০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া এফবিসিসিআইয়ের অধীনে থাকা বিভিন্ন বাণিজ্য সংগঠনের বার্ষিক চাঁদাও কমানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। যেমন, ‘ক’ শ্রেণির চেম্বারের বার্ষিক চাঁদা ১ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে ৬০ হাজার টাকা এবং ‘ক’ শ্রেণির বাণিজ্য সংগঠনের চাঁদা ৭৫ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ৪৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
আপত্তির পর আবার সংশোধনের উদ্যোগ:
১৯৬১ সালের বাণিজ্য সংগঠন অধ্যাদেশ বাতিল করে ২০২২ সালে নতুন বাণিজ্য সংগঠন আইন করে সরকার। এর ভিত্তিতে গত বছর বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা-২০২৫ প্রণয়ন করা হয়। তবে নতুন বিধিমালার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এফবিসিসিআই, ঢাকা চেম্বার, মেট্রোপলিটন চেম্বারসহ কয়েকটি ব্যবসায়ী সংগঠন আপত্তি জানায়। এসব আপত্তির পর বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। বিধিমালা সংশোধন না হওয়ায় এফবিসিসিআইয়ের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরও ভোট গ্রহণ হয়নি। এ নিয়ে একাধিক রিট মামলাও করা হয়।
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, তাঁরা যে ধরনের সংশোধনী চেয়েছিলেন, তার বেশির ভাগই খসড়ায় এসেছে। দ্রুত সংশোধনী চূড়ান্ত হলে সংগঠনগুলো নির্বাচনে যেতে পারবে। তবে এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সহসভাপতি আবুল কাসেম হায়দার মনোনীত পরিচালক রাখার প্রস্তাবের সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, সরকারের মাধ্যমে মনোনীত পরিচালক নিয়োগের সুযোগ থাকলে সংগঠনের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।

